এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা না নিয়ে জেএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত জানার পর শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা এখন ঘুরপাক খাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির দুশ্চিন্তায়। জানুয়ারিতে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা আছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তির কথা বললেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাধিক উপাচার্য এখনো কেন্দ্রীয় ভর্তির ব্যাপারে মত দিয়েছেন। করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

আগামী ১৫ অক্টোবর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সঙ্গে ইউজিসির বৈঠক আছে। সেখানে ভর্তি নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা যায়। 

এদিকে এবারের এইচএসসি ও সমমানের ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করায় খুশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যেহেতু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সীমিত, তাই আগের তুলনায় শিক্ষার্থী দ্বিগুণ বাড়ার আশা করছে তারা। বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ভিত্তিতে এইচএসসির যে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা একে স্বাগত জানাই। কারণ করোনার মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ আসলেই ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু এবার সব শিক্ষার্থীই পাস করছে, এতে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বাড়বে বলেও আমার মনে হয়।’

এবার যেহেতু জেএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে, তাই ওই দুটি পরীক্ষার একটিতে যারা অপেক্ষাকৃত খারাপ ফল করেছে, তাদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আবার যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায়, তাদেরও বিষয়ভিত্তিক ভালো নম্বরের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যারা এসএসসিতে তুলনামূলক ভালো না করে এইচএসসি দিয়ে তা পূরণের প্রস্তুতি নিয়েছিল, তারা বড় সমস্যায় পড়বে। কারণ তাদের এইচএসসির ফলও অনেকটা এসএসসির মতো হবে। এতে অনেকেই উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিত বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না। একইভাবে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা প্রশ্নবিদ্ধ হবে কি না, সে সংশয় থেকে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কিভাবে মূল্যায়িত হবে, এটা আমাদের নিজস্ব ব্যাপার। শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে গেলেও নম্বর নিয়েই যাবে।’

তবে এসএসসির পর যারা বিভাগ পরিবর্তন করে এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছে, তাদের মূল্যায়নের জন্য একটি পরামর্শক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাদের মতামতের ভিত্তিতে এই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হবে। কিন্তু এই কমিটি এখনো কাজ শুরু করেনি বলে জানা গেছে।

গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘কিভাবে ভর্তির কাজটি হবে, সেটি এখনই বলা সমীচীন হবে না। আমরা আশা করছি, সমন্বিত বা গুচ্ছপদ্ধতিতেই সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নিতে পারব। সেই পরীক্ষাগুলো কিভাবে হবে, গুচ্ছপদ্ধতি কেমন হবে, তখনকার কভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কারণ এখনো তিন মাস বাকি আছে।’

জানা যায়, গত বছর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার পর সব বিশ্ববিদ্যালয়কে চারটি ভাগে ভাগ করে চলতি বছর থেকে পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে ইউজিসি। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তাব দেন। তাঁরা বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এই তিন ভাগে ভাগ করে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইউজিসি শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি, প্রকৌশল ও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি ধাপে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজনের কথা জানায়। ইউজিসি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই ঠেলাঠেলির মধ্যেই করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে।

তবে গত মার্চে ইউজিসির বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কোনো পদ্ধতিতেই আসতে রাজি হয়নি। তারা নিজেরাই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে অনড় অবস্থান ব্যক্ত করে। কিন্তু বড় এই পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয় না এলে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের কোনো আকর্ষণই থাকবে না। তাই ওই অবস্থান থেকে সরে এসে গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয় ইউজিসি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ২৩ মার্চ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে একটি সভা ছিল। সেটি করোনার কারণে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। করোনার এই সংকটে সামনে শীত। বিশ্ববিদ্যালয় কবে খুলবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; যদিও ভর্তি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনলাইনে সভা করে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তবু সরকার যেহেতু এইচএসসির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন আমাদের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভালো হলে অবশ্যই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। এর বিকল্প নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোন পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ভর্তি কমিটি, ডিনস কমিটি ও একাডেমিক কাউন্সিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিগগিরই এসব আলোচনা শুরু করা হবে।’ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নেবে কি না এবং করোনার মধ্যে শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব হবে কি না জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘এর প্রতিটি বিষয়ই ওই সব কাউন্সিল ও কমিটিতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা গুচ্ছপদ্ধতিতে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করাব। আগের সভা অনুযায়ী বড় পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা পরীক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তি করবে। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক স্বার্থ সামনে রেখে বড় পাঁচটিও গুচ্ছবদ্ধ পরীক্ষায় চলে আসবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। ১৫ অক্টোবর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে একটি বৈঠক আছে। সেখানে বিষয়টি আলোচনা হবে বলে আশা রাখছি।’

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, ‘পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় না এলেও বাকিদের নিয়ে আসন্ন শিক্ষাবর্ষ থেকেই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। গুচ্ছ বলি আর কেন্দ্রীয় বলি, সমন্বিতভাবে পরীক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তি এখন সময়ের দাবি। গোটা ভারতে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সেখানে আমাদেরও পারার কথা। আমেরিকায় স্যাট নামে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সুতরাং বাংলাদেশেও এমন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি এখন জনগণের দাবি। যারা এই পদ্ধতিতে আসবে না, তারা জনগণের কাছে প্রশ্নের মুখে পড়বে।

0000

আজকের জনপ্রিয়

0000