সিলেটে তরুণীকে তুলে নিয়ে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় অন্যতম আসামি সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে জানা গেছে।

এই চারজনকে সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জ ও নবীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনার পর দ্বিতীয় দিন গতকাল রবিবারও প্রতিবাদে উত্তাল ছিল সিলেট। বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ করেছে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে। এ ছাড়া ধর্ষণের শিকার ওই তরুণী গতকাল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগকর্মী সাইফুর রহমান ভারতে পালানোর জন্য সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নোয়ারাইয়ে সুরমা নদীর খেয়াঘাটে আসবেন—

এমন তথ্যের ভিত্তিতে ছাতক সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে ছাতক থানার পুলিশের একটি দল ভোরে সেখানে অবস্থান নেয়। সকাল ৭টার দিকে ধর্ষক সাইফুর সেখানে এলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পরে তাঁকে সিলেট নগরের শাহপরান থানায় হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত সাইফুর সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দেরপাড়া গ্রামের তাহির মিয়ার ছেলে।

ছাতক সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার বিল্লাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ধরা না পড়তে সাইফুর দাড়ি কেটে ফেলে। সে মাস্ক পরে খেয়াঘাটে আসে। এ সময় তার পরনে টি-শার্ট ও প্যান্ট ছিল। ভোরে সে সীমান্ত এলাকায় এসে পৌঁছে।

সম্ভবত সীমান্ত এলাকায় গিয়ে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা ছিল তার।’ সাইফুরকে পালিয়ে যেতে কেউ সাহায্য করছিল কি না সেটি নিশ্চিত হতে ছাতক ও দোয়ারাবাজারে তাঁর আত্মীয়-স্বজন সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

শাহপরান থানার ওসি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রযুক্তির সহায়তায় সাইফুরের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।’

গতকাল সকাল ১০টায় মামলার আরেক আসামি ও ছাত্রলীগকর্মী অর্জুন লস্করকে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত অর্জুন জকিগঞ্জের আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে। মাধবপুর পুলিশ জানিয়েছে, পুরো অভিযান গোয়েন্দা পুলিশ পরিচালনা করেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর পালিয়ে সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জে নিজের বাড়িতে যান অর্জুন। পরদিন বিকেলে হবিগঞ্জের মাধবপুরে এক আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে আত্মগোপন করেন। সেখান থেকে তিনি গ্রামের বাড়ি জকিগঞ্জে এক ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রাখছিলেন।

একাধিকবার তাঁদের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পায় গোয়েন্দা পুলিশ। পরে গতকাল সকালে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল মাধবপুরের বহরা ইউনিয়নের (মনতলা) সীমান্তবর্তী গ্রামে দুর্লভপুর এলাকায় পৌঁছে।

এরপর তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় অর্জুনের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে ওই গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অর্জুনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

এদিকে গতকাল রাত ১০টার দিকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় রবিউল ইসলামকে। প্রায় একই সময়ে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আরেক আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা আমাদের হেফাজতে আছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সময় হলেই তাদের আদালতে তোলা হবে।’

আদালতে ঘটনার বর্ণনা দিলেন ভুক্তভোগী তরুণী : এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়া তরুণী (২০) গতকাল সিলেটের মহানগর হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক শারমিন খানম নীলার কাছে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) অমূল্য কুমার চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুপুর দেড়টার দিকে পুলিশ ওই তরুণীকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে আদালতে আনে। বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।’ জবানবন্দি দেওয়ার সময় ভুক্তভোগীর স্বামী ছাড়াও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন।

এসএমপির প্রেস ব্রিফিং : ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে গতকাল বিকেল ৩টার দিকে প্রেস ব্রিফিং করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)। প্রেস ব্রিফিংয়ে এসএমপির উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, ‘গণধর্ষণ মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সীমান্তসহ সব জায়গায় আমাদের নজরদারি রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন ইউনিট বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে আমরা তৎপর আছি, আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই তরুণী তাঁর স্বামীর সঙ্গে সিলেট শহরের টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়েছিলেন। রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে স্বামী গিয়েছিলেন সিগারেট কিনতে। ফিরে এসে দেখেন, স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করছেন কয়েকজন তরুণ। স্বামী প্রতিবাদ করলে মারধর করে তাঁদের দুজনকে গাড়িসহ জোর করে তুলে নিয়ে যান ওই তরুণরা। পাশের বালুচর এলাকায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে স্বামীকে একটি স্থানে আটকে রাখা হয়। তরুণীকে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের একটি কক্ষের সামনে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। আসামিদের সবাই ছাত্রলীগের কর্মী বলে জানা গেছে।

দ্বিতীয় দিনেও উত্তাল সিলেট : এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে গতকালও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। ধর্ষকদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সকাল সাড়ে ১১টায় নগরের টিলাগড়ে এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে যৌথভাবে মানববন্ধন করে সিলেট জেলা ও এমসি কলেজ শাখা ছাত্রলীগ। একই দাবিতে বিকেল সাড়ে ৪টায় নগরের চৌহাট্টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করে মহানগর ছাত্রলীগ। এর আগে দুপুর ১টার দিকে নগরের বালুচর এলাকায় এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে পাবলিক ভয়েস ওয়ার্কিং ফর বাংলাদেশ। একই স্থানে বিকেল ৪টায় প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি যৌথভাবে পালন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও সম্মিলিত নাট্য পরিষদ। তাদের কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে শতাধিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন। বিকেল ৫টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে একই দাবিতে প্রতিবাদী সমাবেশ ও মানববন্ধন করে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সিলেট মহানগর শাখা।

সিটি করপোরেশনের প্রতিবাদী পদযাত্রা : সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলররা প্রতিবাদ পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগর ভবন থেকে পদযাত্রা নিয়ে তাঁরা নগরের উপশহরে মহানগর পুলিশ কমিশনারের অস্থায়ী কার্যালয়ে যান। সেখানে তাঁরা পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন।

এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘কিভাবে আমরা আমাদের পক্ষ থেকে তাঁকে (পুলিশ কমিশনার) ও তাঁর প্রশাসনকে লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া যায় সে বিষয়ে কথা বলেছি।’

হবিগঞ্জে নিন্দার ঝড় : অভিযুক্ত ধর্ষকদের অন্যতম শাহ মাহবুবুর রহমানের বাড়ি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার বাগুনিপাড়া গ্রামে। সেখানকার মানুষ তাঁর প্রতি ধিক্কার ও নিন্দা জানিয়েছে বলে আমাদের হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানাচ্ছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শাহ মাহবুবুর রহমানের ছবিসহ পোস্ট দিয়ে নিন্দা জানাচ্ছে। সেই সঙ্গে তাঁকে ধরিয়ে দিতে অনুরোধ করছে। এ ছাড়া হবিগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে।