২০১৯ সালের জুন মাসে বরগুনায় বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় রিফাতের স্ত্রী মিন্নিসহ ৬ জনকে গত বুধবার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের কারাগারের ‘কনডেম সেল’ এ রাখা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারের যে বিশেষ সেলে রাখা হয় সেটিকে কনডেম সেল বলা হয়। কারাগারে থাকা অন্যান্য বন্দিদের তুলনায় কনডেম সেলের বন্দিদের জন্য ভিন্ন আচরণবিধি রয়েছে এবং অন্যান্য বন্দিদের থাকার জায়গার সাথেও কনডেম সেলের বেশ পার্থক্য রয়েছে।

‘কনডেম সেল’ এর সাথে কারাগারের অন্যান্য সেলের পার্থক্য কী?
সাধারণত মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের কারাগারের অন্যান্য অপরাধীদের চেয়ে আলাদা ধরণের কক্ষে রাখা হলেও বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধি মোতাবেক সেরকম কোনো আইন নেই বলে জানান সাবেক কারা

উপ মহাপরিদর্শক শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর একজন বন্দিকে কারাগারে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা, দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলেও আলাদা কক্ষে রাখার বিষয়টি আইনে নির্দিষ্ট করে উল্লেখিত নেই।

তবে কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণ অপরাধীদের চেয়ে কনডেম সেলের আসামিদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন বলে মন্তব্য করেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধিতে ফাঁসির আসামিদের কনডেম সেলে রাখার মত কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকলেও তাদের আলাদা ধরণের কক্ষে রাখা হয়। 

এটিকে এক ধরণের রেওয়াজ বলা যেতে পারে। একটি কনডেম সেলে সাধারণত ১ জন কিংবা ৩ জন বন্দি রাখা হয়ে থাকে।’

শামসুল হায়দার বলেন, ‘সাধারণত ধারণা করা হয় যে দুইজন বন্দি থাকলে গোপনে পালানোর পরিকল্পনা করতে পারে, তবে তিনজন থাকলে পরিকল্পনা আর গোপন থাকে না। ওই ধারণা থেকেই দুইজন বন্দি একটি কনডেম সেলে রাখা হয় না।’

কারাবিধি অনুযায়ী, একজন বন্দির থাকার জন্য ন্যুনতম ৩৬ বর্গফুট (৬ফিট বাই ৬ ফিট) জায়গা বরাদ্দ থাকতে হবে। তবে বাংলাদেশের জেলগুলোতে কনডেম সেলের ক্ষেত্রে এই আয়তন কিছুটা বেশি হয়ে থাকে।

একজন বন্দি থাকার কনডেম সেল সাধারণত ১০ ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের হয়ে থাকলেও বাংলাদেশের অনেক জেলেই সেলের মাপ কিছুটা বড় হয়। আর তিনজন বন্দি যেসব সেলে রাখা হয় সেগুলোর আয়তন আরও বড় হয়ে থাকে।

কনডেম সেলের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য সাধারণত অন্যান্য সেলের তুলনায় অনেক ছোট আকারের জানালা থাকে। আর এসব সেলে থাকা বন্দিদের দিনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেলের বাইরে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়।

কনডেম সেলে থাকা বন্দিরা মাসে একদিন দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার সুযোগ পান। আগে একসময় জেলের ভেতরেই কনডেম সেলে থাকা বন্দিদের সাথে দেখা করতে আসতে পারতেন দর্শনার্থীরা। তবে এখন মাসে একদিন জেল গেটে তারা দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার সুযোগ পান।

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, ‘একসময় কনডেম সেলের বন্দিদের নিজেদের সেলের বাইরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেল থেকে বছরের পর বছর বের হননি, এমন উদাহরণও আছে।

কিন্তু একটা ছোট ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, তাই বর্তমানে সব বন্দিদেরই দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় বাইরে চলাফেরা করতে দেয়া হয়।’

একজন বন্দি একবারে সর্বোচ্চ ৫ জন দর্শনার্থীর সাথে দেখা করতে পারেন। কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণত কনডেম সেলের প্রত্যেক বন্দির কাছ থেকে তার নিকটাত্মীয়দের তালিকা নেন, নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া কনডেম সেলের বন্দির সাথে দেখা করতে অনুমতি দেয় না কারা কর্তৃপক্ষ।

সাধারণত মাসে একদিন বন্দিদের সাথে দর্শনার্থীদের দেখা করার অনুমতি দেয়া হলেও বিশেষ বিবেচনায় কখনো কখনো ১৫ দিনের মধ্যেও কনডেম সেলের আসামির সাথে দর্শনার্থীদের দেখা করতে দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

উচ্চ আদালতে দণ্ড পরিবর্তিত হলে কী হয়?
মাঝেমধ্যে দেখা যায় কোনো একটি বিচারিক আদালতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ পরিবর্তিত হয়েছে।

বাংলাদেশে এই ধরণের বেশকিছু ঘটনা রয়েছে যেখানে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করার পর তার সাজা কমেছে বা মওকুফ হয়েছে। আর এই ধরণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘসময় লেগে থাকে বলে মন্তব্য করেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

এসব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চতর আদালত থেকে বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কনডেম সেলেই থাকতে হয় বন্দিকে। শামসুল হায়দার বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত উচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বাতিল না করছে, ততদিন পর্যন্ত এ বন্দিকে কনডেম সেলেই থাকতে হয়। কারা বিধি অনুসরণ করে কনডেম সেল থেকে গিয়েই বন্দিকে আদালতের কার্যক্রমে যোগ দিতে হয়।’

আর এরকম অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে বন্দিকে বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। বাংলাদেশে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো বন্দির কনডেম সেলে থাকার নজির আছে বলে জানান শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বহু নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি।

0000

আজকের জনপ্রিয়

0000