দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর সাত মাস পার হতে চলেছে। পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না। কিন্তু সংক্রমণ রোধে গত মার্চে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির পরই মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। সংক্রমণঝুঁকি মাথায় নিয়েই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে সব কিছু। করোনা সংক্রমণের শঙ্কায় বাসাবাড়িতে প্রবেশাধিকার না মেলায় ৯৫ শতাংশ গৃহকর্মীই এখনো বেকার।

করোনা সংক্রমণের শঙ্কায় মার্চ-এপ্রিলেই বেশির ভাগ পরিবারে গৃহকর্মী বাদ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য মতে, বর্তমান সময়ে এসে মাত্র ৫ শতাংশ গৃহকর্মীকে পুনরায় কাজে নেওয়া হয়েছে। বাকি ৯৫ শতাংশই এখনো বেকার। অনেকে গ্রামে ফিরে গেলেও সেখানেও বেকার বসে থাকতে হচ্ছে। পেটের দায়ে অনেকে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে হাত পাতছে।

মিরপুর ১৩ নম্বরে প্রায় ১০ বছর ধরে গৃহকর্মীর কাজ করেন জোহরা খাতুন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘করোনার আগে চার বাসার কাজে মাসে ৯ হাজার টাকা বেতন পাইছি। অসুস্থ স্বামী আর তিন মাইয়া নিয়া বস্তিতে থাকি। করোনা বাড়তে থাকলে গত এপ্রিল মাসে আমারে সবাই বাদ দিছে। গত কয়েক মাস বাড়ি বাড়ি ঘুরছি; কিন্তু কেউ আমারে রাখে না। সবাই প্রশ্ন করে আমার করোনা আছে কি না, আমাদের বস্তিতে কার কার করোনা হইছে, টেস্ট করাইছি কি না। টেস্ট করাইতে কুনো যামু, তা-ও জানি না। এদিকে আয় না থাকায় ঘরভাড়া দিবার পারি না। তিনবেলা খাবার জোটে না।’

করোনা সংক্রমণের এই সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, বাড্ডা ও মিরপুর এলাকায় গৃহকর্মীদের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে নারী মৈত্রী একটি স্বল্পমেয়াদি জরিপ চালিয়েছে। এতে বলা হয়, গৃহকর্মীদের শতকরা ৮০ জনের ওপর তার শিশু সন্তান এবং ৩০ শতাংশের ওপর পরিবারের বয়স্করা নির্ভরশীল। করোনা সংক্রমণে বেকার হয়ে পড়া এসব শ্রমজীবীর মাত্র ৫ শতাংশ ছয় মাস পর এসে কাজ ফিরে পেয়েছে। বাকিরা এখনো বেকার।

সরেজমিনে রাজধানীর ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, সেগুনবাগিচা, মিরপুর ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা সংক্রমণের ভয়ে গত মার্চের শেষের দিকে বা এপ্রিলের প্রথম ভাগ থেকেই বেশির ভাগ পরিবারে বাইরের মানুষ প্রবেশ বন্ধ। এসব পরিবার নিজেদের সুরক্ষায় বিনা নোটিশে গৃহকর্মীদের বাদ দিয়েছে। গত মাস থেকে কিছু পরিবারে সীমিত পরিসরে গৃহকর্মী নেওয়া হলেও বেশির ভাগ বাসায়ই গৃহকর্মী প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

বেশির ভাগ পরিবার মনে করছে, গৃহকর্মীরা করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য সুরক্ষার শর্তগুলো মেনে চলতে পারবে না। আবার কোনো গৃহকর্মী সারা দিনে একাধিক বাসায় ঠিকা কাজ করে। ফলে তারা এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে ভাইরাস বহন করে নিয়ে আসতে পারে।

মিরপুর এলাকার এক গৃহকর্ত্রী মমতাজ জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাসায় বুয়া থাকলেও বাইরে যে ছেলেটা কাজ করত তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। প্রায়ই ফোন দিয়ে কাজে ফিরতে চায়; কিন্তু করোনার এই সময়ে ওকে রাখাটা পরিবারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গৃহকর্মীদের কর্মহীনতা পুরো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বেকার হয়ে পড়া এই শ্রমশক্তিকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং বিশেষ উদ্যোগে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা বড় একটি বিকল্প হতে পারে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, গৃহকর্মীদের বেশির ভাগই অসহায় নারী। করোনা পরীক্ষা করানো তাদের পক্ষে সাধারণত সম্ভব হয় না। অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার সুযোগও কম। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় গৃহকর্মীদের সুবিধা দিতে হবে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, করোনার কারণে শহরে কর্মরত গৃহকর্মীরা বেশি সংখ্যায় কাজ হারিয়েছে। পরিবারের সুরক্ষা বিবেচনায় তাদের বেশির ভাগকেই এখনো কাজে নেওয়া হয়নি। ব্যবসা করতে সরকার তাদের বিনা সুদে সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই শহরে কাজ করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য মতে, বাংলাদেশে গৃহকর্মী পেশায় যুক্তদের ৯০ শতাংশই নারী। গৃহকর্মীদের ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’-এর আওতাবহির্ভূত রাখায় তাদের মানবিক অধিকার, শোভন কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। করোনায় কাজ হারিয়ে ওরা সংকটে আছে।

0000

আজকের জনপ্রিয়

0000