আবারও পুড়ল মিরপুরের রূপনগরের চলন্তিকা বস্তি। শুক্রবার ভোরে সেখানে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এর আগেই ছাই হয়ে যায় দুই শতাধিক ঘর।

আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস। মাত্র ৫ মাস আগেই পুড়েছিল বস্তিটি। শুক্রবার ভোরে বস্তির সব মানুষই যখন ঘুমিয়ে, ঠিক সে সময় লাগা আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। বস্তির অধিবাসীরা বলছেন, আগুনে সহায়-সম্বল সবই গেছে, পুড়ে গেছে স্বপ্নও।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা রাসেল শিকদার বলেন, শুক্রবার ভোর সোয়া ৪টায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ১৫টি ইউনিট আগুন নেভাতে কাজ শুরু করে। দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর সকাল সোয়া ৬টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনার তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্তের পরই বলা যাবে।

রূপনগর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূচনা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবেও আগুন লাগানো হতে পারে। তবে যেভাবেই লাগুক, বাসিন্দাদের অনেকেই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতেন। আগুন লাগার পর সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গেলে রহিমা বেগম নামে বস্তির এক অধিবাসী যুগান্তরকে বলেন, ‘শুধু গতরের কাপড়টাই আছে আর কিছুই নাই। কোনো একটা জিনিস নিয়ে বের হতে পারি নাই।’ তিনি বলেন, ‘৪০ বছর ধরে এই বস্তিতে আছি। এখানে আমার ১৩টি ঘর ছিল। ৬টাতে দুই ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিরা থাকত। বাকিগুলো ছিল ভাড়া দেয়া। সব ভস্ম হয়ে গেছে।’

রহিমা বলেন, ‘আগুন কেমনে লাগে, আমরা বুঝি। কিন্তু বলার ভাষা নেই। আমাদের পুনর্বাসন করলেই তো আমরা এ জায়গা ছেড়ে চলে যাই।’ তিনি বলেন, ‘সরকার ১৭ লাখ রোহিঙ্গাকে ঠাঁই দিতে পারে আর আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকায় না। আমাদের আকুল আবেদন, আপনারা আমাদের জীবন নিয়ে খেলবেন না।’

পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনকে ফোন করছিলেন রিকশাচালক হুমায়ূন কবির। বলছিলেন, ‘ভাড়ার টাকাও তো নাই, কীভাবে বাড়ি আসব।’

তিনি যুগান্তরকে জানান, তার বাড়ি ভোলার চরফ্যাশনে। তারা নদী ভাঙনের শিকার। চলন্তিকা বস্তিতে তিনি পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন।

হুমায়ূন বলেন, ‘একটা সুতোও বের করে আনতে পারি নাই।’

ফরিদপুরের সালেহা বেগম বস্তির মাসুকের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ঝিয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

তিনি বলেন, রাত ২টায় ঘুমাই। যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন দেখি আগুন ঘরের কাছাকাছি চলে এসেছে। কোনোরকম জানটা নিয়ে সরে এসেছি।

গার্মেন্টকর্মী নাজমা বেগম আহাজারি করে বলেন, ‘এই শীতে কোথায় থাকব, কী পড়ব আর কী খাব বুঝতে পারছি না। এখন ছাইয়ের মধ্যেই খুঁজছি, দেখি কিছু পাই কিনা।’

তিনি জানান, স্বামী মারা গেছে কিছুদিন আগে। এখন আগুন আমার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিল।

নাজমা বলেন, ছেলেমেয়েসহ রাতে ঘুমিয়েছিলাম। আগুন-আগুন চিৎকারে জেগে উঠি। বের হয়ে কোনোরকম জানটা নিয়ে পালাই।

আরেক বাসিন্দা শাপলা বানু বলেন, আমরা শীতে মরি, পানিতে মরি। আগুনও আমাদের ছাড়ে না। কোথায় থাকব, কী খাব? গরিবের কোথাও শান্তি নাই।

রাশেদ নামে এক বাসিন্দা বলেন, ৫ মাস আগে আগুন লাগল। এরপর আবারও আগুন। বারবার আগুন লাগে কেমনে আমরা বুঝি না?

তিনি বলেন, উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে গভীর রাতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। নতুবা শীতের রাতে আগুন লাগল কীভাবে?

আরেক বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, কিছুদিন আগে ঝিলপাড় বস্তিতে আগুন লাগলে সব পুড়ে যায় আমার। ওই সময় চলন্তিকা বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া নেই। এক ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে থাকি। আজ সেটাও পুড়ে গেল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও আমার সব পুড়ে গেল। তাই পুড়ে যাওয়া মালপত্র জড়ো করছি। এগুলো বেচলেও কিছু টাকা তো আসবে।

পুড়ে যাওয়া একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব হনুফা বেগম। তিনি বলেন, ’৮৬ সাল থেকে এই বস্তিতে থাকি। একটা দোকান ছিল। ওই দোকান দিয়েই সংসার চলত। আড়াই লাখ টাকার মালামাল ছিল, সব পুড়ে গেছে। এখন এক টাকার জিনিসও নাই দোকানে।

বাদল রিকশার গ্যারেজে কাজ করেন। তিনি বলেন, কাজ শেষে রাতে ঘরে ফিরে ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায় ১২টা বেজে গেছে। ভোরে আগুন আগুন চিৎকারে ঘুম ভাঙে। ঘুম চোখেই বেরিয়ে আসি। চোখের সামনেই পুড়ে যায় ঘর।

তিনি বলেন, আচমকা ঘুম ভেঙে বেরিয়ে আসায় ঘর থেকে কিছুই বের করে আনতে পারিনি।

বস্তিবাসী জসিম উদ্দিন বলেন, দুই শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। বিভিন্নজনের পক্ষ থেকে বস্তিতে খিচুরি পাঠানো হয়েছে। পাশের বঙ্গবন্ধু স্কুলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এভাবে কতদিন থাকব আমরা।

বস্তির বাসিন্দা মো. হানিফ বলেন, গত বছরের ১৬ আগস্ট আগুন লাগে এখানে। এরপর এই এলাকায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়। এতে বলা হয়- নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের পুনর্বাসনের জন্য ফ্ল্যাট প্রকল্পের নির্ধারিত স্থান এটি। সাইনবোর্ড টানানোর পর হাইকোর্টে রিট করেছি। ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আরও কিছু লোকজন মিলে মোট ১২৬ জন এ রিটের পক্ষে স্বাক্ষর করেছে। রিটে জানতে চাওয়া হয়েছে- এখানে যদি বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করে ভবন করা হয়, সেই ভবনে কারা থাকবে? যদি বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করে অন্য কাউকে সেই ভবনে তোলা হয় তাহলে আমরা এ জায়গা ছেড়ে দেব না। আর যদি বস্তিবাসীদের জন্য এখানে ভবন করা হয়, তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।