ব্রাম্মণবাড়িয়ায় দু’টি ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনায় চালকের গাফলতিকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করে তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, সিগনাল অমান্য করার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা রেল বিভাগে জনবল সংকট এবং সেজন্য ট্রেন চালকদের অতিরিক্ত পরিশ্রম বা বাড়তি চাপকে অন্যতম একটি কারণ হিসেবে দেখছেন।

তারা বলেছেন, মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি হলেও রেল বিভাগ বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত রয়েছে। ১২ই নভেম্বর মঙ্গলবার ভোররাতে এই দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৬জন নিহত হয়েছে। আহত অর্ধশতাধিক যাত্রীর মধ্যে গুরুতর অবস্থায় ৬জনকে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ঘটনার ৮ ঘন্টা পর ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম এবং সিলেটের ট্রেন চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়েছে বলে কর্মকর্তারা বলেছেন। প্রাথমিকভাবে এই ঘটনার কারণ হিসেবে গাফিলতির কথা বলা হলেও ৫টি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

সিগন্যাল অমান্য বিতর্ক

তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক, সহকারী এবং গার্ডকে গাফিলতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনও বলেছেন, তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক, সহকারী এবং গার্ডের গাফিলতির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

রেলমন্ত্রী বলেছেন, “সিগন্যাল অমান্য করার কারণে হতে পারে। সিগন্যাল দেয়ার ক্ষেত্রে কোন ত্রুটি ছিল কিনা, সেটা বলতে পারছি না। তবে আমরা প্রথমিকভাবে ড্রাইভারকে দয়ী মনে করছি।”

তবে বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করছেন ভিন্নভাবে। বাংলাদেশের রেলওয়ের সিগন্যাল ব্যবস্থা কতটা আধুনিক হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ফলে সব বিষয় তদন্তের আগে শুধু চালকের গাফিলতিকে চিহ্নিত করা নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শামসুল আলম ট্রেনের চালকসহ রেলওয়েতে লোকবলের ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলছিলেন, “চালক এখানে তন্দ্রায় ছিল কিনা, সেটাও একটা বিষয়। চালক অতিরিক্ত পরিশ্রমে বা বাড়তি চাপে ছিল কিনা, সেটা তদন্ত কমিটির খতিয়ে দেখা উচিত।”

অধ্যাপক আলম উল্লেখ করেছেন, “রেলওয়েতে এখন অবকাঠামো এবং ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এই বিভাগ অবহেলিত ছিল। জনবলের ঘাটতি কিন্তু ছিল। সে কারণে চালকদের বাড়তি চাপ বহন করতে হতে পারে। এই বিষয়টি বড় কারণ হতে পারে।”

রেলওয়ে মন্ত্রীও লোকবলের অভাবের কথা স্বীকার করেছেন। মন্ত্রী বলেছেন, “১৯৮৬ সাল থেকে রেলওয়েতে নিয়োগ একেবারে বন্ধ ছিল। বিএনপি সরকারের সময়ে রেলওয়ে থেকে ১০হাজার কর্মকর্তা কর্মচারীকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক কর্মসূচিতে বিদায় করা হয়েছিল। ফলে ট্রেনের চালকসহ লোকবলের সংকট এখনও রয়েছে।”

তিনি আরও বলেছেন, “আগের সরকারগুলোর সময় রেলওয়েকে গুরুত্বহীন এবং লোকসানি একটা প্রতিষ্ঠান বানানো হয়েছিল। আমাদের আওয়ামী লীগ সরকার এখন রেল বিভাগকে গতিশীল করতে অনেক প্রকল্প নিয়েছে। সেখানে লোকবল বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে।”

রেল মন্ত্রী জানিয়েছেন, রেলওয়ে যেহেতু টেকনিক্যাল বিভাগ, সেকারণে রাতারাতি এখানে লোক পাওয়া কঠিন। ফলে ট্রেনের চালক যারা অবসরে যাচ্ছেন, তাদেরকেও চুক্তিতে নিয়োগ করা হচ্ছে।

তিনি মনে করেন, ট্রেনের চালকের সংকট থাকায় তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। এ বিষয়টিও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখবে বলে তিনি মনে করেন।

এক যাত্রীর কথা

দু’টি ট্রেনের এই সংঘর্ষে বা দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫২ বছর বয়সী রেণু বেগম। তিনি শিশু নাতিকে সাথে নিয়ে সিলেট থেকে চট্টগ্রামে ছেলের বাড়ি যাচ্ছিলেন। রেণু বেগম জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি প্রচণ্ড শব্দ এবং প্রবল ধাক্কা অনুভব করেছিলেন। এরপর তার জ্ঞান ছিল না।

জ্ঞান ফেরার পর গুরুতর আহত অবস্থায় ব্রাম্মণবাড়িয়া হাসপাতালের বিছানায় তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন। কিন্তু তার ১২ বছর বয়সী নাতি নিহত হয়েছে। তিনি নাতির নিহত হওয়ার খবর পেয়ে হাসপাতালের বিছানায় বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।

তিনি বলেন, “ট্রেনে পা ভাঙছে, মাথা ভাঙছে। বাবারে আমার নাতিটা মইরা গেছে।” নিহতদের বেশির ভাগই মহিলা এবং শিশু। তাদের মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আহতদের ব্রাম্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল এবং ঢাকায় সিএমএইচসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। উদয়ন এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি সিলেট থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। আর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিল তূর্ণা নিশীথা আন্ত:নগর ট্রেন।

মঙ্গলবার ভোররাত তিনটার দিকে ব্রাম্মণবাড়িয়ার কসবায় মন্দবাগ রেলষ্টেশনে ট্রেন দু’টির মধ্যে সংঘর্ষ হয়। রেলওয়ে মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, সিলেট থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী ট্রেনটি যখন প্রধান লাইন থেকে শাখা লাইন বা লুপ লাইনে প্রবেশ করছিল, তখন এর পিছনে আঘাত করেছে চট্রগ্রাম থেকে ঢাকা অভিমুখী তূর্ণা নিশীথা।

সেজন্য উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের শেষের কয়েকটি বগির যাত্রীদের মধ্যেই হতাহতে ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “যে স্টেশনে দুঘর্টনাটি ঘটেছে, সেখানে ক্রসিং দেয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। উদয়ন ট্রেনটি লুপ লাইনে চলে গিয়েছিল। এর ১৬টা বগির ১২টা বগিই লুপ লাইনে চলে যায়। ৪টা বগি তখনও লুপ লাইনে ঢুকতে পারেনি। এরমধ্যেই তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের ইঞ্জিন আঘাত করে উদয়ন এক্সপ্রেসের পিছনের বগিগুলোতে। তাতেই ঐ বগিগুলো দুমড়ে মুচড়ে গেছে।”