সারা দেশের পুরনো সব রেল সেতু মেরামতের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে রোববার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একগুচ্ছ উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ নির্দেশনা দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, রেলওয়ের কাছে আমার একটা অনুরোধ থাকবে, আমরা রেললাইন বাড়াচ্ছি এবং নতুন নতুন বগি ও যাত্রী পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছি। তবে রেলের পুরনো ব্রিজ, কালভার্টের ওপর ব্রিজসহ বিভিন্ন রেল ব্রিজগুলো মেরামত করতে হবে। তিনি বলেন, এগুলো অত্যন্ত পুরনো হয়ে যাওয়ায় রেল চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টিসহ যাত্রী নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।

আগের সরকারের আমলে রেল ব্যবস্থা বন্ধের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কারণে বছরের পর বছর চলে গেছে এসব ব্রিজ মেরামত করা হয়নি। তারা গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে রেলের লোকবল বিদায় করে দিয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গার লাইন বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, সারা দেশে সার্ভে করে যেখানে যত পুরনো রেল ব্রিজ আছে সেগুলো মেরামত করতে হবে। এজন্য প্রকল্প গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।

এছাড়া চট্টগ্রাম ওয়াসার চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন ও স্যানিটেশন প্রকল্পের (১ম সংশোধিত) আওতায় নির্মিত ‘শেখ রাসেল পানি শোধনাগার’ এবং খুলনা ওয়াসার ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প’র আওতায় নবনির্মিত ‘বঙ্গবন্ধু ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ ও বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ১২ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

সূচনা বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়া পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের উপকারভোগী, চট্টগ্রামের পানি শোধনাগারের উপকারভোগী, খুলনা পানি শোধনাগারের উপকারভোগী, চট্টগ্রামে টেলিভিশনের উপকারভোগী ও জামালপুরের রেল ব্যবহারকারী উপকারভোগীদের সঙ্গে সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মতবিনিময় করেন। শেখ হাসিনা বলেন, দেশের উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করাই হল বর্তমান সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য। এ কারণে সারা দেশে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। শহর ও গ্রামের মানুষকে সমান সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার কাজ করছে।

তৃণমূলের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ছাড়া কখনও একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা দেশের সার্বিক উন্নযন করতে হলে শুধু রাজধানীভিত্তিক উন্নয়ন করলেই হবে না, একেবারে গ্রামের মানুষ, তৃণমূলের মানুষদের উন্নতি করতে হবে।

ক্ষমতায় আসার পর অনেকগুলো পানি শোধনাগার নির্মাণের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আমরা পানি শোধনাগার করেছি। আমার একটা অনুরোধ থাকবে, পানি ব্যবহারের সময় যেন সবাই মিতব্যয়ী হই। তিনি বলেন, নোনা পানির জন্য খুলনাবাসীর পানির অভাব তীব্র ছিল। তাদের কষ্ট লাঘবের জন্য মধুমতি নদী থেকে পানি এনে শোধন করে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ১ লিটার পানি শোধন করতে প্রচুর টাকা খরচ হয়। কাজেই পানির অপচয়টা সবাই বন্ধ করবেন। কল ছেড়ে দিয়ে ব্রাশ করা, সেভ করা বা কল ছেড়ে দিয়ে গোসল করা- এগুলো কেউ করবেন না। প্রয়োজনে বালতি ও মগ ব্যবহার করবেন।

বিভিন্ন স্থানে সেতু নির্মাণের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যোগাযোগের সুবিধার জন্য আমরা বিভিন্ন জেলায় সেতু নির্মাণ করে দিচ্ছি। যোগাযোগের ফলে প্রতিটি অঞ্চলে অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি হচ্ছে। তিনি বলেন, হরিরামপুর মানিকগঞ্জ এমন একটি এলাকা যেখানে সামান্য বৃষ্টি হলেই বন্যা হতো। সবসময় এখানে বন্যা লেগেই থাকত। এখানে যোগাযোগের ব্যবস্থা খুব অনুন্নত ছিল। সেখানে আমরা ব্রিজ করে উন্নত যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছি।

সরকার জনগণের বিনোদন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, চট্টগ্রাম টেলিভিশনের সম্প্রচার সময় বাড়ানোর উদ্দেশ্য হল- চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের কালচারাল অনুষ্ঠানগুলো মানুষ দেখতে পারবে। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরাও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটা মানুষের ভেতরে যে সুপ্ত মেধা রয়েছে সেই প্রতিভার বিকাশ ঘটবে এ টেলিভিশন কেন্দ্রের মাধ্যমে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া এখানে অনেকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। ক্ষুদ্রঋণের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে বলেন, এক সময় আমিও ক্ষুদ্রঋণে উৎসাহিত করতাম কিন্তু দেখা গেল ঋণের পরিমাণ এক সময় এত বেড়ে যায় যে, মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে হয় আত্মহত্যা করে, না হয় ঘর-বাড়ি, ভিটে-মাটি বিক্রি করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। সে আর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। শেখ হাসিনা বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য কখনোই এ ক্ষুদ্রঋণ কার্যকর নয়। কাজেই একটা মানুষ যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই ক্ষুদ্রঋণের পরিবর্তে সরকার ক্ষুদ্র সঞ্চয়ভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ (বর্তমানে আমার বাড়ি আমার খামার) প্রকল্প শুরু করে। দরিদ্রদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখার জন্যই তার সরকার ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক’ চালু করেছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী এএইচএম মুস্তাফা কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, এলজিআরডি ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন এবং সাবেক কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলাল উদ্দিন আহমেদ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মজিবুর রহমান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম ও তথ্য সচিব কামরুন্নাহার তাদের মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। এছাড়া পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।