বাগানের মরিচ গাছ ছিড়ে ফেলা, শিশুদের দিয়ে কলিং বেল চাপানোর মতো তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে দুই সহকর্মীর মধ্যে বিরোধের শুরু। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। মিমাংসাও হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গড়ায় মামলা মোকাদ্দমায়। বদলি করা হয় মামলার বাদী মাসুদা বেগমের স্বামী আকতার আহমদ বখতিয়ারকে।

মামলা করেও কোনো সুরাহা না পেয়ে উপায়ন্তু না দেখে এসব বিষয়ে সুবিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন মাসুদা বেগম। আর এ বিষয়টি জানার পর এখন চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হতে হয়েছে মাসুদার স্বামী আকতার আহমদকে।

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস গ্যাস ফিল্ডস কম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)-এর প্রধান কার্যালয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আওতাধীন মেঘনা গ্যাস ফিল্ডের সিনিয়র নিরাপত্তা প্রহরী ছিলেন আকতার আহমদ বখতিয়ার। কম্পানির মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এ টি এম শাহ্ আলম গত ৮ সেপ্টেম্বর আকতার আহমেদকে দেওয়া এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘স্ত্রীকে দিয়ে নিয়ম নীতি বর্হিভূতভাবে প্রতিষ্ঠানের সুনামহানি করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আবেদন করায় দায়ে আপনাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।’

এর আগে আকতার আহমদকে তিতাস গ্যাস ফিল্ড থেকে একই কম্পানির আওতাধীন মেঘনা গ্যাস ফিল্ডে বদলি করা হয়। তিনি তিতাস গ্যাস ফিল্ডে প্রায় ৩২ বছর ধরে চাকরি করে আসছিলেন। আকতার আহমদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হওয়া মো. হেলাল উদ্দিন একই কম্পানির গাড়িচালক। তিনি ডিজিএমসহ গুরুত্বপূর্ণ তিন কর্মকর্তার গাড়িচালান।

কাগজপত্র ঘেঁটে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের ১০ জুলাই। ওইদিন আকতার আহমদ বখতিয়ারের বাসার সামনের বাগানের মরিচ গাছ ছেঁড়ায় গাড়িচালক হেলাল উদ্দিনের চার বছর বয়সি ছেলেকে গালাগাল করা হয় ও হেলাল উদ্দিনের কলার চেপে ধরা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে আকতার আহমেদকে জবাব দিতে বলা হয়। লিখিত জবাব প্রাপ্তির পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষ মিমাংসা করে দেন। তবে দুই পক্ষের মধ্যে মানসিক দূরত্ব থেকে যায়। এ বছরের ৩ জুন আকতার আহমদের সবজি বাগান ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট ও পরবর্তীতে বাসায় ঢুকে আকতার আহমদকে মারধর করা হয় বলে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। আকতার আহমেদের স্ত্রীর দায়ের করা অভিযোগ ২১ জুন থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এরপরই পুলিশ সেখানে তদেন্ত যায়।

এরই মধ্যে ১৬ জুন কম্পানির এক আদেশে আকতার আহমদ বখতিয়ারকে কম্পানির তিতাস গ্যাস ফিল্ড থেকে মেঘনা গ্যাস ফিল্ডে বদলি করা হয়। যথারিতি সেখানে যোগ দেন আকতার আহমদ। কম্পানির নিয়ম অনুযায়ি আকতার আহমদের পরিবারকে কম্পানি বরাদ্দকৃত বাসা ১৫ আগস্টের মধ্যে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হলে করোনা পরিস্থিতিতে সময়ে চেয়ে নেন। নিজের অসুবিধার কথা জানিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর আবার তিতাস ফিল্ডে আনতে ও বাসা বরাদ্দ বাতিলের আদেশ বদলাতে আবেদন করেন আকতার আহমদ।

এর আগে ২৬ জুলাই আকতার আহমেদের স্ত্রী মাসুদা বেগম সার্বিক বিষয় জানিয়ে প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত আবেদন করেন। ৮ সেপ্টেম্বর আকতার আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

কথা হয় বিজিএফসিএল’র গাড়ি চালক ও কর্মচারী ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মরিচ গাছ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে আমার ছোট্ট সন্তানকে গালাগাল করা হয়। আমি এর প্রতিবাদ করলে আমাকেও গালাগাল করা হয়। আমরা যে ভবনে থাকি সেই ভবনের আরেক শিশুকেও মারধর করে আকতারের পরিবার। বিষয়টি মিমাংসা করা হলে উল্টো আমাদের নামে মামলা দেয়। পরবর্তীতে ওনাকে বদলি করা হয় শুনেছি। বদলি পর নিয়ম অনুযায়ী কোয়ার্টার না ছাড়ায় কর্তৃপক্ষ বরখাস্ত করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

চাকরি জীবনের শেষ বয়সে এসে বরখাস্তের ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন আকতার আহমেদ। তবে ভবিষ্যত ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না। কম্পানি কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রতি সুদৃষ্টি দিবেন বলে তিনি আশাবাদী।

আকতার আহমেদের স্ত্রী মাসুদা বেগম ও মেয়ে আন্নী বখতিয়ার এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে চাকরির শেষ সময়ে এসে স্বামী ও পিতার এমন পরিণতিতে তারা ভেঙে পড়েছেন বলে জানান। আকতার আহমেদের বর্তমান শারিরিক অবস্থা নিয়েও তাঁরা চিন্তিত।

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কম্পানি লিমিটেড এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, ‘একই কোয়ার্টারে থাকা দুই কর্মচারির মধ্যে বিরোধের বিষয়টি আমরা মিমাংসা করে দেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও তাঁদেরকে মিলিয়ে দেন। তারপরও ছোটদের মধ্যে হওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে আকতার আহমদ থানায় মামলা করেন। আমি ফোনে কথা বলে ও আকতার আহমদের বাসায় লোক পাঠিয়েও এ বিষয়ে সুরাহা করতে পারিনি। যে কারণে কম্পানির কোয়ার্টারে পুলিশও আসে। পুলিশ স্বাভাবিক আচরণ করেনি। তাই মনে হচ্ছে কেউ এটা করাচ্ছে। পরবর্তীতে আকতার আহমেদকে কম্পানি কর্তৃপক্ষ বদলি করে কোয়ার্টার ছাড়তে বললেও ছাড়েননি। এসব কারণে এখন তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এখন যদি তিনি আমাদের কাছে এসে এসব না বলেন তাহলে আমরা কি করব। ওনি প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছেন শুনেছি। কিন্তু আমরা তো আর এত দূর পর্যন্ত যেতে পারব না।’

আকতার আহমেদের স্ত্রী মাসুদা বেগমের দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘অভিযোগের তদন্তে পুলিশ যেতেই পারে। এতে দোষের কিছু না। সেখানে গিয়ে ঘটনার তদন্ত করা হয়েছে। মারপিটের যে অভিযোগ করা হয়েছে সে বিষয়ে হাসপাতালের রিপোর্ট পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কম্পানি লিমিটেড’র মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এ টি এম শাহ্ আলম ওই কর্মচারীকে সাময়িক বরাখাস্তের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব কম্পানির একটা নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম মতেই চলতে হবে। নিয়ম বর্হিভূত কাজ করায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’

আকতার আহমদকে বরখাস্তের কথা উল্লেখ করে দেওয়া চিঠির ভাষা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে আবেদন করায় এমন করা হলো কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটা আমি জানি না। নিশ্চয়ই কোথাও নিয়ম না মেনে দরখাস্ত দিয়েছে।’ আকতার আহমদকে বরখাস্তের চিঠিতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আবেদন করার অভিযোগের কথাটা মূলত কাকে বুঝানো হয়েছে সে বিষয়েও ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।

0000

আজকের জনপ্রিয়

0000