প্রায় ৩২ বছর আগে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় নাজমা নিলুফার নামের এক নারীকে। বহু বছর আগেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর হাসপাতালে ভর্তির সময় রেজিস্টারে তাঁর ঢাকার মিরপুরের যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে তাঁকে পাঠানো হয়। কিন্তু সে ঠিকানার কোনো অস্তিত্ব নেই। বাধ্য হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাজমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এখন তাঁর ঠিকানা ১৫ নম্বর ওয়ার্ড।

নাজমা আক্তার নামের আরেক নারী, যাঁর বাড়ি গাজীপুরের নীলনগর গ্রামে। তিনি ২০১১ সাল থেকে একই হাসপাতালের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছেন। মানসিক স্থিতিশীলতা আসার পর চলতি বছরের ২ মার্চ তাঁকে বাড়ি পাঠানো হয়। কিন্তু নাজমার বাড়ির লোক তাঁকে গ্রহণ করেনি।

পরিবার আর সমাজের কাছে ‘বোঝা’ মনে হওয়া এই নারীরা আজও অপেক্ষায় আছেন একদিন কেউ না কেউ তাঁদের নিতে আসবে। এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১০ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস।

এই উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার সকালে পাবনা মানসিক হাসপাতালে সরেজমিনে যান এই প্রতিবেদক। বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে ১ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে গেলে গ্রিলের ভেতরে দাঁড়ানো মাসুম নামের এক রোগী বলেন, ‘ভাই, আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার গিরিশপুর গ্রামে। আমার বাড়ির কাউকে খবর দেবেন, যেন আমাকে নিয়ে যায়।’

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে মাসুমের এই আর্তি কি স্পর্শ করতে পারবে তাঁর পরিবারের লোকদের? কিংবা নাজমা নিলুফার বা নাজমা আক্তারের মতো যাঁরা সুস্থ হয়েও স্বজনদের কাছে ফিরতে আকুল, তাঁরা কি পারবেন ফিরে যেতে?

হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সুস্থ হওয়ার পরও স্বজনরা ফিরিয়ে নেয়নি এমন অন্তত ১১ জন বছরের পর বছর হাসপাতালে আছেন। তাঁদের মধ্যে ঢাকার মধ্য বাসাবো এলাকার বদিউল আলম ১ নম্বর ওয়ার্ডে ১৫ বছর ধরে, মগবাজারের নয়াটোলা এলাকার সাঈদ হোসেন ১২ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪ বছর, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে পাবনা পৌর এলাকার আটুয়া মহল্লার ডলি ৯ বছর, একই ওয়ার্ডে রাধানগর মহল্লার জাকিয়া সুলতানা ১১ বছর, ঢাকার শাঁখারীবাজারের শিপ্রা রানী রায় ২১ বছর, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ঢাকার টিকাটুলী এলাকার শাহনাজ আক্তার ২১ বছর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের নাইমা চৌধুরী ১১ বছর, কাটাসুর এলাকার গোলজার বিবি ২০ বছর এবং মোহাম্মদপুর এলাকার অনামিকা (বুবি) ২১ বছর ধরে পড়ে আছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারাজনিত কারণে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এসব রোগী সুস্থ হলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা ফিরিয়ে নিতে চায় না। পরিবারের কোনো সদস্য মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লে সমাজ স্বাভাবিকভাবে দেখে না বলেও কেউ কেউ তাদের স্বজনদের হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে নিতে চায় না। এ কারণে অনেক রোগীর স্বজনই হাসপাতালে ভর্তির সময় ভুল নাম বা ঠিকানা দেয়।

নাজমা নিলুফারকে ভর্তির সময় হাসপাতালের রেজিস্টারে বাবার নাম লেখা হয়েছিল এ কে লুত্ফুল করিম। ঠিকানা : রাজধানীর মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশন। ৩১ বছর পাঁচ মাস আগে ১৯৮৯ সালের ১ এপ্রিল যখন তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল ২৮ বছর। সেই নাজমার বয়স এখন ৬০ বছর। হাঁটতে কষ্ট হয়, শ্রবণশক্তিও কমে এসেছে অনেকখানি। গভীর হতাশা গ্রাস করেছে তাঁকে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার রায় জানালেন, হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী সুস্থ হওয়ার পর স্বজনরা নিয়ে না গেলে হাসপাতালের কর্মচারীদের দিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ভর্তির সময় রেজিস্টারে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী নাজমা নিলুফারকেও মিরপুরের ওই ঠিকানায় পাঠানো হয়েছিল; কিন্তু সে ঠিকানার কোনো অস্তিত্বই নেই।

আবার ঠিকানা অনুযায়ী যাঁদের বাড়ি খুঁজে পাওয়া গেছে, পরিবারের অন্য সদস্যরা তাঁদের গ্রহণ করেনি। তিনি বলছিলেন, সারা দেশে হাসপাতালে মানসিক রোগীদের জন্য মাত্র ৯০০ শয্যা রয়েছে। পাবনা মানসিক হাসপাতালের কিছু শয্যায় সুস্থ হয়ে ওঠা রোগী থাকায় নতুন রোগী ভর্তি করতে সংকট হচ্ছে।

হাসপাতালের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মো. মাসুদ রানা সরকার বলেন, ছাড়পত্র পাওয়ার উপযুক্ত হওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালের ওয়ার্ডে পড়ে রয়েছেন ওই ১১ জন। চলতি বছরের মার্চ মাসে দেওয়া হাসপাতালের মেডিক্যাল বোর্ডের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, হতাশা, বার্ধক্যসহ নানা কারণে তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থার খানিকটা অবনতি হয়েছে। তিনি জানান, মানসিক ভারসাম্যহীন এসব নারী-পুরুষ সুস্থ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের কাছে যেতে চান; কিন্তু তাঁদের প্রতি পরিবারের সদস্যদের অনীহার বিষয়টি যখন তাঁরা উপলব্ধি করতে পারেন, তখন মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েন।