কক্সবাজারের উখিয়ায় বিশাল কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এখন উত্তপ্ত পরিস্থিতি। গত এক সপ্তাহে সহিংস ঘটনায় এখানে নিহত হয়েছেন ৭ রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন অর্ধশত। সন্ত্রাসীরা পুড়িয়ে দিয়েছে ৪টি বাড়ি। অব্যাহত হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে ৮ শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার।

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ রোহিঙ্গারা কুতুপালং ক্যাম্পকে আর নিরাপদ মনে করছেন না। তারা দ্রুত প্রত্যাবাসন চান। প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হলে যেতে চান নোয়াখালীর ভাসানচরে। বুধবার রাতে সন্ত্রাসীরা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে উখিয়ার নিবন্ধিত ক্যাম্পের সি-ব্লকের বাসিন্দা সৈয়দ হোসেনের বসতঘরটি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি এখন আশ্রয় নিয়েছেন কুতুপালং বাজার এলাকায় এক আত্মীয়ের ঘরে। তিনি বলেন, ‘আমার কী অপরাধ জানি না।

সন্ত্রাসী বাহিনী রাতের আঁধারে কেন আমার ঘরটি পুড়িয়ে দিয়েছে বুঝতে পারছি না।’ সৈয়দ হোসেন বলেন, উখিয়ার বিশাল কুতুপালং ক্যাম্প এখন সন্ত্রাসীদের দখলে। খুন-খারাবি, অপহরণ, মাদক ব্যবসা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সন্ত্রাসীদের প্রতিমাসে চাঁদা না দিলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে চরম নির্যাতন।

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের মানবিক সরকার আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। এখন অমানবিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাঁচতে আবার পালাতে হচ্ছে।’

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা পুড়িয়ে দিয়েছে কুতুপালং সি-ব্লকের বাসিন্দা আহমদ উল্লাহর বসতঘরটিও। পরিবারের ৯ সদস্যকে নিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন এ-ব্লকে একটি এনজিও সংস্থার অফিস ঘরের পেছনের বারান্দায়। সাধারণ এই রোহিঙ্গা পরিবারটি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়। ভাসানচরে যেতে আগ্রহী কিনা জানতে চাইলে আহমদ উল্লাহ বলেন, ‘মাথার ওপর একটু ছায়া থাকলেই হবে। ভাসানচর কেন যেকোনো স্থানে যেতে রাজি। কুতুপালং ক্যাম্পে আর থাকতে রাজি নই।’

কুতুপালং ডি-৫ ব্লকের ফরিদ আলমকে মঙ্গলবার রাতে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনী। দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় তার পরিবারের কাছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না পাওয়ায় পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে সেপটিক ট্যাঙ্কের ভেতরে ফেলে দেওয়া হয় ফরিদকে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন এই রোহিঙ্গা যুবক। বৃহস্পতিবার সকালে লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। আতঙ্কে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে ফরিদের পরিবার। কুতুপালং বাজারের কাছে একটি এনজিও সংস্থার অস্থায়ী ঘরে আশ্রয় নিয়েছে পরিবারটি। ফরিদের মা আমেনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে জীবিত পেয়েছি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আমরা আর কুতুপালং ক্যাম্পে থাকতে চাই না।’

কুতুপালং ক্যাম্পের সিআইসি অফিস-সংলগ্ন এনজিও সংস্থার ওই ঘরে আশ্রয় নিয়েছে আরও কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবার। তারা ক্যাম্পের সি ও ই ব্লক থেকে পালিয়ে এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। এ রোহিঙ্গারা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে সন্ত্রাসীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে সন্ত্রাসী একটি গ্রুপের প্রধান মাস্টার মুন্নার দুই ভাইও রয়েছে। ক্যাম্পে নির্বিচারে বাড়িঘরে হামলা হচ্ছে। অপহরণ করা হয়েছে কয়েক জনকে। এতে আতঙ্কিত হয়ে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
কুতুপালং ক্যাম্পের একজন মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) জানান, গত এক সপ্তাহে কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পের সি এবং ই ব্লক থেকে প্রায় এক হাজার পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র পালিয়েছে। তারা ক্যাম্পে তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছে। অনেকে কুতুপালং বাজারে বিভিন্ন অস্থায়ী শেডে আশ্রয় নিয়েছে।

বুধবার রাতে কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পের সি-৭ ব্লকে আগুন দেয় সন্ত্রাসী বাহিনী। এতে ৪টি ঘর পুড়ে যায়। একই সময়ে উখিয়া টিভি টাওয়ারের পেছনে রোহিঙ্গা বস্তিতে আগুন দেওয়া হয়। এখানেও একটি বাড়ি পুড়ে যায়। স্থানীয়রা জানান, রোহিঙ্গা শিবিরে সংঘর্ষ লেগেই আছে। এবার টানা এক সপ্তাহেও থামেনি। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লাশ পড়েছে ৭ জনের। এই সংঘর্ষে অতিষ্ঠ সাধারণ রোহিঙ্গারা। তাদের অনেকেই নিরাপদ স্থানে চলে যেতে ইচ্ছুক। এখন ভাসানচরে যেতেও প্রস্তুত সাধারণ রোহিঙ্গারা।
গতকাল শুক্রবার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরের কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, এখানে সন্ত্রাসীরা দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষে সাধারণ রোহিঙ্গারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর সংখ্যা বেশি না হলেও পুরো ক্যাম্প তাদের হাতে জিম্মি। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ রোহিঙ্গারা। এ অবস্থায় নিরাপদ স্থানে চলে যেতে চায় সাধারণ রোহিঙ্গারা। সেটা ভাসানচরও হতে পারে।

রোহিঙ্গাদের জন্য নোয়াখালীর ভাসানচরে আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। তবে সেখানে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিরোধিতা করে আসছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে কয়েকটি গ্রুপও ভাসানচরবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও কোনো অবস্থাতেই তারা সাধারণ রোহিঙ্গাদের সেখানে যেতে দিতে রাজি নয়। যারা যেতে চায় তাদের হত্যার হুমকিও দিচ্ছে। এরপরও ক্যাম্পে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সাধারণ রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে আগ্রহী বলে জানা গেছে।

ক্যাম্প-১৫ লম্বাশিয়া এলাকার রোহিঙ্গা আলম বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবাই অপরাধী নয়। এই অশান্ত পরিবেশে কোনো অবস্থাতেই নিরীহ রোহিঙ্গারা এখানে থাকতে চান না। এখানে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অস্থিরতা লেগেই থাকে। এ কারণে নিরীহ রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে প্রস্তুত।

কুতুপালং ক্যাম্পের একটি অংশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়ে রাখা হয়েছে ৪ শতাধিক হিন্দু রোহিঙ্গা পরিবারকে। তারাও প্রত্যাবাসনে আগ্রহী। মিলন কুমার মল্লিক নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারে ফিরতে চাই। না হলে আমাদের ভাসানচরে নেওয়া হোক।’ তিনি বলেন, কুতুপালং ক্যাম্পে রাতদিন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে ৪২২টি হিন্দু পরিবার।
কক্সবাজারে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা নয়ন বলেন, রোহিঙ্গারা এমনতিইে ভাসানচরে যেতে প্রস্তুত। তবে কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের বাধা দিচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন। বৃহস্পতিবার উখিয়ায় কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে এ নির্দেশ দেন ডিআইজি। এ সময় তিনি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্যাম্পের সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর নেন।

ডিআইজি বলেন, ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের আধিপত্য বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই। এখানে আধিপত্য থাকবে একমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। অবৈধ অস্ত্রধারী রোহিঙ্গাদের গ্রেপ্তার করা হবে।

নোয়াখালীর ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন করতে চায় সরকার। এজন্য অবকাঠামোসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। ভাসানচরে ১ হাজার ৭০০ একর জায়গাজুড়ে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে বিশাল কর্মযজ্ঞ ও আবাসন সুবিধা গড়ে তোলা হয়েছে। এ চরে মোট জমির পরিমাণ ১৭ হাজার একর। এ হিসেবে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাকে এখানে পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে।

0000

আজকের জনপ্রিয়

0000