খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের বাহারি সব ফোন। বিক্রেতার ফেসবুক পেজে ফোনগুলোর চোখজুড়ানো ছবি। তবে দাম দেখলেই চমকে উঠতে হয়। লাখ টাকা দামের আইফোন ১১ বিক্রি হচ্ছে মাত্র চার হাজার ৪০০ টাকায়! আইফোন ১০-এর দাম আরও ২০০ টাকা কম। স্যামসাং-নকিয়ার কিছু জনপ্রিয় মডেলও কাছাকাছি দামেই পাওয়া যাচ্ছে। শুধু কি তাই? ফোন অর্ডার করলে উপহার দেওয়া হচ্ছে একটি স্মার্টওয়াচ। ক্রেতা পরিচয়ে কথা বলে জানা গেল, অর্ডার পেলে তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্রেতার বাসার ঠিকানায় ফোন পৌঁছে দেন। এমন সুবর্ণ সুযোগ কে হাতছাড়া করতে চায়? তাই আইফোন ১০-এর অর্ডার দেওয়া হলো। এরপর ধাপে ধাপে স্পষ্ট হয়ে উঠল তাদের প্রতারণার কৌশল।

জানা গেল, অনলাইনে নামমাত্র দামে মোবাইল ফোন বিক্রির প্রচুর ফেসবুক পেজ রয়েছে। তাদের চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে অনেকেই প্রতারণার ফাঁদে পা দিচ্ছেন। আর অগ্রিম টাকা নিয়ে তারা যোগাযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে, কখনও গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে চীন থেকে তৈরি করে আনা সস্তা ফোন। এভাবে কিছুদিন প্রতারণার পর সাধারণত তারা সংশ্নিষ্ট পেজ ও ফোন নম্বরগুলো বন্ধ করে দেয়। ফলে তাদের শনাক্ত করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল প্রতারণা রোধে পুলিশের নজরদারি বাড়ছে। এমন কিছু পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়া ভুক্তভোগী কেউ যদি পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন, তাহলে সে ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনলাইন মোবাইল শপ, দারাজ অনলাইন শপ ১, গ্যালাক্সি শপ বিডি, দারাজ বিডি ৭১, স্মার্ট ফোন বাজার, মোবাইল শপ বিডি, আমাজন শপ বিডি, ডিজিটাল স্টোর, ইউনিক ব্র্যান্ডসহ এমন অনেক ফেসবুক পেজ রয়েছে। প্রতিটি পেজেই নামিদামি ব্র্যান্ডের কিছু মোবাইল ফোন বিক্রির বিজ্ঞাপন রয়েছে। যোগাযোগের নম্বরও দেওয়া আছে। ক্রেতা পরিচয়ে ফোন করে জানা গেল বিস্তারিত।

যেভাবে প্রতারণা :‘দারাজ অনলাইন শপ ১’-এর কর্মী আরিয়ান জানালেন, সব ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোনই তাদের সংগ্রহে রয়েছে। অর্ডার কনফার্ম করলে পরদিন দুপুর ১২টার মধ্যে তারা হোম ডেলিভারি দেবেন। ফোন হাতে পাওয়ার পর পছন্দ না হলে ফেরত দেওয়ার সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে শুধু কুরিয়ার সার্ভিসের চার্জ নেওয়া হবে। তাদের প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় কোথায়- জানতে চাইলে তিনি একবার সাভার এবং আরেকবার গাজীপুর বলেন। তবে তাদের ফেসবুক পেজে ঠিকানা হিসেবে পান্থপথ ও জুরাইনের কথা উল্লেখ করা আছে।

আইফোন ১০ কিনতে চাইলে আরিয়ান প্রথমে দুই হাজার ২০০ টাকা অগ্রিম পরিশোধ করতে বলেন। তখন তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তাদের ফেসবুক পেজে বলা হয়েছে- কুরিয়ার সার্ভিসের খরচ বাবদ ১৫০ টাকা আগাম দিলেই ফোন ক্রেতার হাতে পৌঁছে যাবে। এ পর্যায়ে তিনি জানান, সেক্ষেত্রে কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে গিয়ে টাকা পরিশোধ করে ফোন নিয়ে আসতে হবে। এই কথোপকথনের কিছুক্ষণ পর তিনি আবারও কল করেন এবং অর্ডার নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান। তখন তাকে বলা হয়, অর্ধেক টাকা অগ্রিম দেওয়া সম্ভব নয়। কুরিয়ার সার্ভিসের খরচ আগাম নিয়ে যদি তারা হোম ডেলিভারি দেয়, তখন পুরো টাকা দেওয়া যাবে। তাতেই রাজি হন আরিয়ান, ঠিকানা এসএমএস করতে বলেন। ঠিকানা দেওয়ার পর তার মোবাইল ফোন (০১৩০০২৪৯৯১৭) নম্বরে কুরিয়ার খরচ পাঠানো হয়। এরপর তিনি জানান, হোম ডেলিভারি পেতে হলে কমপক্ষে আরও ৫০০ টাকা দিতে হবে। এই প্রতিবেদক ফোন হাতে না পেয়ে আর কোনো টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং কুরিয়ার খরচ হিসেবে পাঠানো  টাকা ফেরত দিতে বলেন। আরিয়ান তখন আবারও ফোন হোম ডেলিভারি দিতে সম্মত
হন। শেষপর্যন্ত তিনি ফোন পাঠাননি, টাকাও ফেরত দেননি। তাদের ফেসবুক পেজে অনেকেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। শাহরিয়ার আল আরমান নামে একজন লিখেছেন, ‘অ্যাডভান্সের টাকাটাই ওদের লাভ। এইসব ধোঁকাবাজি।’ আনোয়ার সাদাত সৈকত লিখেছেন, ‘এরা বাটপার। নষ্ট মোবাইল প্যাকেট করে  ধরিয়ে দেয়। সুতরাং সবাই সাবধান।’ রকিবুল ইসলাম সোহাগ লিখেছেন, ‘এসব ধান্ধাবাজি ছাড় তোরা।’

‘অনলাইন মোবাইল শপ’ নামের আরেক কথিত প্রতিষ্ঠানের কর্মী শাওনের সঙ্গে ক্রেতা পরিচয়ে কথা বলে জানা গেল প্রায় একই রকম তথ্য। তাদের বিজ্ঞাপনে দেওয়া রেডমি নোট ৮ মডেলের ফোনটি কিনতে চাইলে তিন হাজার ৯৫০ টাকা দিতে হবে। ফোন পেতে হলে অর্ধেক টাকা অগ্রিম দিতে হবে। তাদের কার্যালয় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী মার্কেটে বলেও জানান তিনি। ফেসবুক পেজে তাদের বিজ্ঞাপনের নিচে নানারকম মন্তব্য রয়েছে। শেখ মাইশা রহমান নামে একজন জানতে চেয়েছেন, এগুলো  ক্লোন ফোন কিনা? জবাবে বলা হয়েছে- না। আরেকজন জিজ্ঞেস করেছেন, ফিচারগুলো সত্যিই আছে কিনা? তাকেও আশ্বস্ত করা  হয়েছে, এগুলো আসল ফোন, সব ফিচার ঠিকঠাক আছে।

নকল ফোনে চালু হবে না সিমকার্ড : বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) মুখপাত্র মনিরুল বাশার বলেন, দামের অস্বাভাবিক রকমের পার্থক্য দেখেই সন্দেহ করা উচিত সেটি আসল ফোনসেট কিনা। ওই দামে আসল তো দূরের কথা, মাস্টার কপিও পাওয়া যায় না। ক্রেতাকে সচেতন হতে হবে, যাচাই করে নিতে হবে। এখন যে কেউ ফোন কেনার আগে আইএমইআই নম্বর দিয়ে আসল-নকল যাচাই করে নিতে পারেন। মোবাইল ফোন আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ২০১৭ সাল থেকে বৈধভাবে দেশে আসা সব ফোনের প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ করা আছে। সরকারের উদ্যোগে তথ্যভান্ডারটির আরও আধুনিকায়নের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নকল ফোনসেটে কোনো অপারেটরের সিমকার্ড চালু হবে না।

যাচাইয়ের উপায় : বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যেই মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়। বিটিআরসি জানায়, মোবাইল ফোনসেট কেনার আগে ইংরেজি হরফে ‘কেওয়াইডি’ লিখে স্পেস দিয়ে ফোনের ১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বর দিয়ে তা ১৬০০২ নম্বরে পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে তারা জানিয়ে দেবে সেটটি বৈধ কিনা।

0000

আজকের জনপ্রিয়

0000