বরগুনার বহুল আলোচিত রিফাত হত্যা মামলার ৪২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের সইমোহর গতকাল শনিবার সন্ধ্যার পরে হাতে পেয়েছেন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিপক্ষ।

রায়ের কপি হাতে পেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করতে শনিবার সন্ধ্যার পরে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরসহ অন্যান্য আসামির অভিভাবকরা।

পূর্ণাঙ্গ রায়ের ৪২৫-২৬ ও ২৭ পৃষ্ঠায় আদালতের অবজারভেশনে বলা হয়েছে, ‘ওপরের আলোচনা হইতে দেখা যায়, আসামি রিফাত ফরাজী, রাব্বি আকন, সিফাত, টিকটক হৃদয়, মো. হাসান ও মিন্নি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ভিকটিম রিফাত শরীফ হত্যার অভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ঘটনার তারিখ,

সময় ও স্থানে এই হামলার ঘটনা ঘটাইয়া তাকে খুন করে পেনাল কোডের ৩০২ ও তৎসহ পঠিত ৩৪ ধারায় মৃত্যুদণ্ড, অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তৎসহ অর্থদণ্ডের বিধান রহিয়াছে। উক্ত ৩৪ ধারা মূলত স্বতন্ত্রভাবে শাস্তির বিধান আরোপকারী কোনো ধারা নহে।

উহা অপরাধের মূল শাস্তি আরোপকারী অন্যান্য ধারার পরিপূরক। উহাতে বলা হয়েছে, কতিপয় ব্যক্তি মিলিয়া তাহাদের অভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কোনো অপরাধজনক কাজ করিলে সেই অপরাধের জন্য তাহাদের প্রত্যেকে,

সে একা উক্ত কাজ করিলে যেভাবে দায়ী হইত ঠিক সেইভাবেই দায়ী হইবে। তদানুসারে, এই মামলার ভিকটিম রিফাত শরীফকে খুন করিবার দায়ে উক্ত আসামীগণ সমানভাবে দায়ী।

অবজারভেশনে আরো বলা হয়েছে, ‘ওপরের আলোচনা হইতে দেখা যায়, আসামি মিন্নি এই মামলার ঘটনার পরিকল্পনার মূল উদ্যোক্তা (মাস্টারমাইন্ড) এবং তাহার কারণেই হতভাগ্য রিফাত শরীফ নির্মমভাবে খুন হইয়াছেন এবং তাহার পিতা-মাতা পুত্র হারা হইয়াছেন।

তাহার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হইলে তাহার পদাঙ্ক অনুসরণে তাহার বয়সী মেয়েদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকিবে। তাই এই মামলায় তাহার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। 

প্রকাশ্য দিবালোকে সনাতনী অস্ত্র রামদাও দ্বারা কোপাইয়া সংঘটিত এই মামলার নির্মম হত্যাকাণ্ড মধ্যযুগীয় বর্রতাকেও হার মানাইয়াছে। উক্ত নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটনকারী অন্যান্য আসামিরা প্রত্যেকে যুবক। তথ্য প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে যুবসমাজসহ দেশ বিদেশের সব বয়সের মানুষ উক্ত নির্মতা প্রত্যক্ষ করিয়াছে।

এমতাবস্থায়, তাহাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে তাহাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া দেশের যুবসমাজ ভুল পথে অগ্রসর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই তাহাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

এমতাবস্থায় উক্ত আসামিদের কৃত অপরাধের গুরুত্বসহ উল্লিখিত অবস্থাদি সার্বিকভাবে বিবেচনায় তাহাদের প্রত্যেককে পেনাল কোডের ৩০২ ও তৎসহ ৫০,০০০/- টাকার অর্থদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হইল।’ 

রায়ে আরো উল্লেখ করা হয়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীরা আপিল করতে চাইলে এই আদেশের ৭ (সাত) দিনের মধ্যে দায়ের করতে হবে। তাই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ অপর পাঁচ আসামির সব অভিভাবক রায়ের সহিমোহর নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজধানী ঢাকায় রওনা হয়ে গেছেন।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে কিশোর গ্যাং বন্ড বাহিনী কুপিয়ে জখম করে রিফাত শরীফকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দিন বিকেলেই বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান রিফাত।

পর দিন ২৭ জুন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো পাঁচ থেকে ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ছয় দিনপর ২ জুলাই ভোরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন এ মামলার আলোচিত প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড।

তদন্ত শেষে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্ক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই ভাগে বিভক্ত করে দুটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ।

এর মধ্যে, ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক আসামি এবং ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় অভিযোগপত্রে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় তাকে। পরে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচার শুরু হয়।

৮ জানুয়ারি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি এ মামলার ৭৬ জন সাক্ষির জবানবন্দি নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের বিরুদ্ধের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন আদালত। ১৬ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির রায় ঘোষণার জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়।