বাংলাদেশ থেকে নানা প্রলোভন ও কৌশলে নারীদের পাচার করে এনে রাখা হয় দুবাইয়ের বিভিন্ন ড্যান্স বারে। এরপর নাচ-গানের আড়ালে তাদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। এতে রাজি না হলে আটকে রেখে চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
গত জুন মাসে দুবাইয়ের একটি ড্যান্স বার থেকে বাংলাদেশের তিন নারীকে উদ্ধারের পর নতুন করে আলোচনায় আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নারী পাচারের বিষয়টি। এরপর দেশটির ফুজাইরার দুটি হোটেল থেকে আরও সাত নারীকে উদ্ধার করে দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট।

এসব নারীর বর্ণনায় উঠে আসে ফুজাইরা সিটি টাওয়ার হোটেলে নারীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করার মূল হোতা আজম খান। দুবাই পুলিশের দেওয়া তথ্যে বাংলাদেশ থেকে আজম খান ও তার চার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। এদিকে একই অভিযোগে ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে কোরিওগ্রাফার ও নৃত্যশিল্পী ইভান শাহরিয়ার সোহাগকে।

উদ্ধার করা নারীদের দেওয়া তথ্য ও সিআইডি সূত্র বলছে, দেশ থেকে তরুণীদের আরব আমিরাতে কাজ দেওয়ার কথা বলে ভ্রমণ ভিসা দিয়ে থাকে দালাল চক্র। কারও বেতন ধরা হয় মাসে ৫০ হাজার, কারও ৪০ হাজার টাকা। কেউ কেউ পেয়ে যান অগ্রিম ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। এক মাস থেকে তিন মাসের ভ্রমণ ভিসায় আমিরাতে প্রবেশের পর এসব নারীর ঠাঁই হয় দেশটির বিভিন্ন ড্যান্স ক্লাবে। এরপর দালালরা বাধ্য করে তাদের অনৈতিক কাজে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা আটকে থাকে সাত মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত। বকেয়া পড়ে যায় বেতন। তখনও তাদের আটকে রেখে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়।

জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের শুরুতে দেশটির সরকারি অনুমতি সাপেক্ষে বাংলাদেশিরা প্রবাসীদের বিনোদনের জন্য ড্যান্স বার চালু করে। শুরুতে সীমিত সংখ্যক ড্যান্স বার থাকলেও ধীরে ধীরে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ড্যান্স বারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আরব আমিরাতের আবুধাবি, দুবাই, ফুজাইরা, রাস আল খাইমা, আজমান, দিব্বা, হাত্তা ও আল আইনে ৬০ থেকে ৭০টি ড্যান্স বার রয়েছে। এসব বারে অন্তত দেড় হাজারের মতো বাংলাদেশি নারী নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করছেন।

দেশটিতে ড্যান্স বার পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম থাকলেও বাংলাদেশি মালিকরা সেসব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে চলেছে। বর্তমানে আরব আমিরাতের বিভিন্ন হোটেলে বাংলাদেশিদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ড্যান্স বারের মধ্যে ফুজাইরার ক্লিপ্টন হোটেল, ভি হোটেল, ক্লিপ্টন ড্যান্স বার-২, ক্যালিফোর্নিয়া হোটেল ও দিব্বা হোটেল ড্যান্স বার অন্যতম। দুবাইয়ে আল রাজ, পনেসিয়া, সেন্ট্রাল প্যারিস, ক্যালিফোর্নিয়া, সান অ্যান্ড সান হোটেল, গালফ স্টার, সাফরান বুটিক, সিটি স্টার, ক্লারিজ হোটেন, প্ল্যান হোটেল, ইউরেকা হোটেল, ভেনটা হোটেল, শাদাফ ভেলমন হোটেল, হলিডে ইন, ফরচুন দেরা, রয়েলটন ও রয়েল ফ্যালকন নামের ড্যান্স বার উল্লেখযোগ্য।

আবুধারিতে রয়েছে মিনা হোটেল ও সাবা হোটেল। আজমান প্রদেশে রয়েছে বৈশাখী ড্যান্স বার, শেরাটন হোটেল ড্যান্স বার ও হাত্তা মাদাম বাংলাদেশি ড্যান্স বার। রাস আল খাইমা প্রদেশে আকাশি হোটেল, এসএইচ হোটেল, জুলফার ক্লাব, জুলফার ড্যান্স বার-২, হিল্টন ড্যান্স বার, কাসাব্লাঙ্কা ড্যান্স বার ও ক্যাপিটাল হোটেল।

এসব ড্যান্স বারের কোনো কোনোটিতে শতাধিক বাংলাদেশি নারী আটক রয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। তবে দুবাইয়ের বিভিন্ন ড্যান্স বার হোটেলের মালিক জানান, বাংলাদেশিদের বিনোদনের জন্য দেশ থেকে নৃত্যকর্মী হিসেবে তিন থেকে ছয় মাস বা এক বছরের চুক্তিতে আমিরাতে নিয়ে আসা হয়। দুবাই কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এসব নারীকে কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়। মালিকদের দাবি, নারীরা কাজে নিয়োগ পাওয়ার পর হোটেল কর্তৃপক্ষ বা মালিক পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি হলে তা সরাসরি পুলিশকে জানানোর সুযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে আবুধাবি দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর আবদুল আলিম মিয়া সমকালকে বলেন, আবুধাবিতে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। দুবাই ও আবুধাবির প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভিন্ন। আবুধাবিতে এসব বিষয়ে কঠোরতা রয়েছে।

দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ইকবাল হোসাইন খান বলেন, আমিরাতে শুধু বাংলাদেশি নয়; ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও ড্যান্স বার পরিচালনা করছে। সরকারি অনুমোদন নিয়ে নিয়ম মেনে এগুলো পরিচালনা করতে হয়। নারীকর্মীরা স্বেচ্ছায় এসব ক্লাবে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করে সময়মতো বেতন পেলে তো অভিযোগ থাকার কথা নয়। তবে তাদের ওপর শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতন অথবা অনৈতিকভাবে কোনো কাজে বাধ্য করার অভিযোগ পেলে তা গুরুত্ব সহকারে দেখেন তারা।

0000

আজকের জনপ্রিয়

0000