জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম খুনি রিসেলদার (বরখাস্ত) মোসলেহ উদ্দিনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে- এমন তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম।

দেশটির আনন্দবাজার, এনডিটিভি-সহ কয়েকটি গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

গত সোমবার (২০ এপ্রিল) আনন্দবাজারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের গোয়েন্দাদের একটি সূত্রের দাবি, লকডাউনের সময় এ দেশ থেকে মোসলেহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ায় সমস্যা হতে পারে বলে বিষয়টি ভারতের গোয়েন্দাদের জানায় ঢাকা। ভারতীয় গোয়েন্দারা এই খুনিকে সীমান্তের কোনো একটি অরক্ষিত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তবে সরকারিভাবে কিছুই স্বীকার করা হয়নি।

পরের দিন মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) একই ধরনের সংবাদ প্রকাশ করে ভারতের আরেক গণমাধ্যম এনডিটিভি। গণমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সীমান্তের কোনো এক স্থলবন্দর দিয়ে সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মোসলেহ উদ্দিনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে এ সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। তারা বিষয়টি শুনেছেন বলে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন এআইজি (মিডিয়া) গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বলেও খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা অভিযানটি পরিচালনা করায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সে সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি বলে দাবি এনডিটিভির।

এর আগে সোমবার (২০ এপ্রিল) বঙ্গবন্ধুর খুনি মোসলেহ উদ্দিনকে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা থেকে আটক করার খবর প্রকাশ করে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম।

ওইসব খবরে বলা হয়, ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার একটি  উপশহরে ইউনানি চিকিৎসক সেজে দীর্ঘদিন ভাড়া ছিলেন মোসলেহ উদ্দিন। তবে এবার মোসলেহ উদ্দিন ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে আটক হয়েছেন বলে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে তিনি গোপনে বাংলাদেশে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কয়েকদিন ছিলেন। এরপর আবার ভারতে ফিরে যান বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আব্দুল মাজেদের মতো পরিচয় গোপন করে বঙ্গবন্ধুর আর এক খুনি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়ে রয়েছেন বলে দাবি বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের। মাজেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তার বিষয়ে জানতে পেরেছেন বলে ওই সূত্রের দাবি। ভারতের গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় রিসেলদার (বরখাস্ত) মোসলেহ উদ্দিন নামের এই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে উত্তর চব্বিশ পরগনায় তার ডেরা থেকে আটক করা হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি। আবার অন্য একটি সূত্রের খবর, মাজেদ আটক হওয়ামাত্রই নিজের মৃত্যু-সংবাদ ছড়িয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন মোসলেহ উদ্দিন। 

আনন্দবাজার এর প্রতিবেদনে জানায়, ভারতের গোয়েন্দাদের একটি সূত্রের দাবি, লকডাউনের সময় ভারত থেকে মোসলেহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ায় সমস্যা হতে পারে বলে ঢাকা বিষয়টি ভারতের গোয়েন্দাদের জানায়।’

খবরে বলা হয়, জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হবার পর ফাঁসির আগেই গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে মোসলেহ উদ্দিন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান। এরপর গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়লে তিনি নিখোঁজ হন। উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগর রেলস্টেশন এলাকায় অপরিচিত কিছু ব‌্যক্তির সঙ্গে তাকে সর্বশেষ দেখা যায়।

সূত্র বরাত দিয়ে খবরে আরো বলা হয়, দীর্ঘদিন মোসলেহ উদ্দিন গোবরডাঙ্গার ঠাকুরনগর এলাকার চাঁদপাড়া রোডের একটি বাড়িতে বসবাস করতেন। এই এলাকায় ‘ডাক্তার দত্ত’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং ‘ইউনানি ফার্মেসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে আয়ুর্বেদ ও হোমিও চিকিৎসা করতেন। ঠাকুরনগর রেলস্টেশনের এক নম্বর প্লাটফরমের পেছনে একটি বাড়িতে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ওই এলাকায় প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করছিলেন মোসলেহ উদ্দিন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডে মিশনে অংশ নেয় তার মধ্যে রিসালদার (বরখাস্ত) মোসলেহ উদ্দিন অন্যতম। জানা যায়, গুলির শব্দ শুনে বঙ্গবন্ধু যখন বিষয়টি জানার জন্য নিচে নামছিলেন সেই সময় সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুকে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করে এই মোসলেহ উদ্দিন।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তাকে তেহরান ও জেদ্দা দূতাবাসে দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অন্য খুনিদের সঙ্গে তিনিও দেশ ছেড়ে থাইল্যান্ড হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। এরপর জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। তার কয়েকবছর পর চলে যান ভারতে এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখান থেকেই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে এসব খবর প্রকাশ করা হলেও এখনো সরকারিভাবে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারও এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। ফলে বিষয়টির সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।