মহামারী রূপ নেওয়া করোনাভাইরাসের সংকটেও থেমে নেই স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চিকিৎসাসামগ্রী (ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি, পিপিই, টেস্টিং কিট/ওষুধপত্র) কেনাকাটায় অন্তত ২২ কোটি টাকার সঠিক হিসাব দিতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদফতর।

নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যেই চিকিৎসা দিতে গিয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু কিশোরগঞ্জে ৪২ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ইতিমধ্যে একজন চিকিৎসক ও একজন স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন।

এরই মধ্যে এন-৯৫ মাস্ক কেনাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য অধিদফতর জন্ম দিয়েছে নতুন কেলেঙ্কারি। এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুকূলে অর্থ বিভাগ থেকে ৪০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি বিবরণী ও ব্যয় পরিকল্পনা অর্থ বিভাগে পাঠিয়েছে অধিদফতর।

এর বাইরে বাকি ১৫০ কোটি টাকা খরচের হিসাব অবশ্য পাঠায়নি তারা। সেখানে ল্যাবরেটরির জিনিসপত্র, পিপিই, কিট, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ কেনার যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে তাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১২৮ কোটি টাকা। আর ১০০ কোটি টাকা ভবিষ্যৎ ব্যয়ের পরিকল্পনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। আবার ওই বিবরণীতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা, যা রীতিমতো এক গোঁজামিলের আশ্রয় বলে মনে করেন অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ তো গেল অর্থ ব্যয় আর কেনাকাটা সংক্রান্ত অয়িনম-দুর্নীতি আর হিসাবে গোঁজামিলের কথা। এদিকে এন-৯৫ মাস্ক কেনাতেও কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছে সংশ্লিষ্টরা। বিদেশ থেকে আমদানির কথা বলে দেশীয় কোম্পানি জেএমআই থেকে কেনা হয়েছে এন-৯৫ মাস্ক, যা আদতে এন-৯৫ নয়। বরং সেগুলো সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক।

এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা আর বিতর্কের মধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভুল স্বীকার করে দায়মুক্তি চেয়েছে। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু তাই নয়, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত এন-৯৫ মাস্ক করোনা সেবাদানকারী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেখানে করোনা চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড হিসেবে ঘোষিত হাসপাতালের বাইরে ঢাকা ও সারা দেশের কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীকে এক পিসও এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চরম অব্যবস্থাপনার কারণে সংক্রমণের হার প্রতিদিন বাড়ছে। আমাদের হাতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছি। শুধুই কথামালা দিয়ে আমরা করোনাভাইরাসকে মোকাবিলা করতে চেয়েছি, যা ছিল চরম বোকামি।

আর বিদেশ ফেরতদের কোনোভাবেই আমরা ব্যবস্থাপনা করতে পারিনি। এ ছাড়া অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যেসব অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে এগুলো তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। যেখানে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে সেখানে চিকিৎসাসামগ্রী কেনাতে দুর্নীতি হবে এটাও স্বাভাবিক। আর এন-৯৫ মাস্ক ক্রয় নিয়ে যা হয়েছে তা স্বাস্থ্য অধিদফতরের চরম দায়িত্বহীনতা আর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা।

এদিকে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটায় ২২ কোটি টাকার গরমিলের ব্যাখ্যা চেয়েছে অর্থ বিভাগ। কিন্তু এখনো এর সুষ্ঠু জবাব দিতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। অর্থ বিভাগ থেকে এখন পর্যন্ত ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, এর প্রায় পুরোটাই ছাড় করা হয়েছে। কোয়ারেন্টাইন এক্সপ্রেসের জন্যও ছাড় করা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা।

এটার ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অর্থ বিভাগ। কোয়ারেন্টাইন এক্সপ্রেস বলতে কোন কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে কী কী খাতে এ অর্থ খরচ করা হয়েছে, কী কী জিনিসপত্র কেনা হয়েছে, কাকে পরিশোধ করা হয়েছে, এসবের সুস্পষ্ট কোনো বিবরণ অর্থ বিভাগে জমা দেয়নি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদফতর। ফলে এসব খরচের পৃথক পৃথক কলামে খরচের বিবরণ দেখিয়ে হিসাব বিবরণী পাঠাতে বলেছে অর্থ বিভাগ।

এদিকে সারা দেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এন-৯৫ মাস্ক, পিপিই সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে শুধু ডেডিকেডেট হাসপাতালের বাইরে ঢাকার কিংবা ঢাকার বাইরের অন্য কোনো হাসপাতালে এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করা হয়নি। বরং চিকিৎসকরা নিজেদের পয়সায় সংগ্রহ করে তা ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে ডক্টরস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডাক্তার শাহেদ রফি পাভেল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার এখনো করোনা চিকিৎসায় ডেডিকেটেড ঘোষিত হাসপাতালের বাইরে কোনো হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসককে এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করেনি। এর ফলে সারা দেশেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

আর নিজেরাই সংক্রমিত হচ্ছেন। এটা খুবই উদ্বেগের। শুধুু কিশোরগঞ্জেই ৪২ জন চিকিৎসক আক্রান্ত। আর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ সেখানে ১২০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সারা দেশে এখন পর্যন্ত আড়াইশ চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। অথচ তাদের মধ্যে মাত্র এক-দুজন ওইসব ডেডিকেটেড হাসপাতালের। অর্থাৎ কোনো সুরক্ষা পোশাক ছাড়া চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরা সংক্রমিত হচ্ছেন এটা পরিষ্কার।  জানা গেছে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুকূলে জরুরি ভিত্তিতে কয়েক দফায় ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত বরাদ্দকৃত এ অর্থের মধ্যে ২১ কোটি ২৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ টাকা ব্যয়ের কোনো পরিকল্পনাই নিতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব সুশীল কুমার পাল স্বাক্ষরিত বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ ব্যয়ের পরিকল্পনা বিষয়ে একটি চিঠি গত ২৫ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ৪৫  কোটি ৩৯ লাখ ২২ হাজার ৮০০ টাকার ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই), কিট ও ওষুধপত্র কেনার জন্য ক্রয়াদেশ দিয়ে পণ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ৭৭ কোটি ২০ লাখ ১৫ হাজার ৯০০ টাকার ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি, পিপিই, কিট ও ওষুধপত্র কেনার জন্য ক্রয়াদেশ প্রক্রিয়াধীন। আর ১০০ কোটি টাকা ভবিষ্যতে ব্যয় করার জন্য ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। ৬ কোটি ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে এমএসআর ও পথ্য খাতে দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

এভাবে ২২৮ কোটি ৭৩ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাকি ২১ কোটি ২৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ টাকা ব্যয় হয়েছে বা আগামীতে ব্যয় হবে, এ ধরনের কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি ওই চিঠিতে। এসব ব্যয় বিবরণীর স্বচ্ছতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে অর্থবিভাগ। এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছ থেকে এসব ব্যয়ের সঠিক ব্যাখ্যা ও বিবরণী চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এসব ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী এখনো আমার নলেজে আসেনি। আর অব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ ছাড়া পিপিই ও এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা তো চলমান প্রক্রিয়া। সব চিকিৎসককেই এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই দেওয়া হয়েছে। যারা পাননি তারাও পাবেন।