করোনাভাইরাসের সঙ্গে আরেকটি মহামারি এগিয়ে আসছে—ক্ষুধা, অশিক্ষা আর দারিদ্র্যের মহামারি। সাউথ ক্যারোলাইনার সাবেক গভর্নর এবং জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলি এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যগত মহামারির মুখে রয়েছি—বিষয়টি শুধু এটুকুই নয়, একটি বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয়ের মোকাবেলা করতে হচ্ছে আমাদের।’ তিনি এ সপ্তাহেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করে বলেন, ‘অন্তত ৩৬টি দেশ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

বিসলি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব দেশে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি রয়েছে, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই বললেই চলে। একই কথা প্রযোজ্য ভেন্টিলেটরের ক্ষেত্রেও। আফ্রিকার ১০টি দেশে একটিও ভেন্টিলেটর নেই। আমরা মানুষকে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের (৫০০ কোটি) তুলনায় হাত ধোয়ার সক্ষমতা আছে এমন মানুষের সংখ্যা কম (৪৮০ কোটি)। জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে চারজনের বাড়িতে হাত ধোয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে। একই প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, দরিদ্র দেশগুলোর চিকিৎসক ও নার্সদের ক্ষেত্রে মাস্কের ঘাটতি তো রয়েছেই, পাশাপাশি এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নেই।

গত বছরের নোবেলজয়ী এমআইটির অর্থনীতিবিদ এসথার ডুফলো এর জবাবে বলেন, ‘আমরা ঠিক জানি না।’ জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. ডেভিড নাবারো বলেন, ‘আমরা কিছু বিষয় অনুমান করতে পারি। সেগুলো খুব একটা আশাপ্রদ নয়।’ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিষয়ে আমি অবশ্য এতটা হতাশাবাদী নই। তবে এই দেশগুলোতে প্রত্যক্ষ প্রভাব নিয়ে দ্বিমত থাকলেও পরোক্ষ প্রভাব হবে বিপর্যয়কর। এরই মধ্যে পোলিও নির্মূল অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শিশুদের অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করে এই ভিটামিন। আর স্কুলের সঙ্গেই বন্ধ হয়ে গেছে সেখানে দুপুরে খাওয়ার প্রকল্পটি।

বাংলাদেশে ব্র্যাক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বাড়িপ্রতি আয় কমেছে ৭৫ শতাংশ। কারখানার শ্রমিকদের আয় কমেছে ৭৯ শতাংশ, গাড়িচালকদের ৮০ শতাংশ, শহরের দিনমজুরদের ৮২ শতাংশ, গৃহপরিচারিকাদের ৬৮ শতাংশ এবং রিকশাওয়ালাদের ৭৮ শতাংশ। প্রতি ১০ জনে চারজনের বাড়িতে তিন থেকে চার দিনের খাবার মজুদ রয়েছে।

বেশির ভাগ দেশেই স্কুল বন্ধ। এসব স্কুলে বহু ছাত্রী রয়েছে, যাদের অনেকেই আর স্কুলে ফিরতে পারবে না। তাদের পরিবারের কাছে খাদ্য ও অর্থ ক্রমেই কমতে থাকবে। তখন পরিবারগুলো বিশেষ করে মেয়েশিশুদের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করতে চাইবে না। মেয়েগুলোকে বিয়ে দিয়ে দেবে, যেন অন্তত একটি খাওয়ার মুখ কমে যায়। শিশুকন্যাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেন, অসুখের কারণে যেমন মানুষের মৃত্যু হয়, তেমনি জীবিকা না থাকলেও মানুষ মরে। গরিব দেশগুলোর কষ্ট মানুষ দেখতে পাচ্ছে, লকডাউনের কারণে তাদের জীবিকা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ পর্যটন থাকছে না, বিদেশ থেকে স্বজনদের রেমিট্যান্স আসছে না। বিশ্ব খাদ্য প্রকল্পের মুখ্য অর্থনীতিবিদ আরিফ হুসেইন বলেন, ‘কভিড-১৯ কোটি কোটি মানুষের জন্য বড় ধরনের হুমকি। তবে এর চেয়েও বহুগুণ বেশি মানুষের জন্য এটি হাতুড়ির বাড়ি; কারণ তাদের দুবেলার ভাত জোটে মজুরি পেলে।’

এরই মধ্যে বিশ্ব খাদ্য প্রকল্প সতর্ক করে বলেছে, এই মহামারির জন্য বিশ্বে ক্ষুধার্তের হার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। আমরা জানি, নবজাতক ও সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুরা যখন পুষ্টিহীনতায় ভোগে তখন তাদের মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না। এরা সারা জীবন মেধাহীনতার সংকটে ভোগে। আমরা যদি এক্ষুনি এই ক্ষুধার সংকটের মোকাবেলা করতে না পারি, তাহলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই এই শিশুরা এবং তাদের দেশ পিছিয়ে পড়বে।

ক্ষুধা নিরসনের কাজটি কঠিন; কারণ সম্পদশালী বিশ্ব গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার পরও সাহায্য করতে হবে। গরিব দেশগুলোর ঋণ মওকুফ করা যায়। সে ক্ষেত্রে তাদের সরাসরি সাহায্য করা হবে। কেনিয়ার দারিদ্র্য বিমোচন গ্রুপ শোফকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেনেডি ওডেডে বলেন, “খাদ্যের জোগানে এরই মধ্যে টান পড়েছে। বহু মানুষ এখন বেকার। মানুষ আধপেটা খেয়ে টিকে আছে। কোনো নিরাপত্তা বা ব্যবস্থা নেই। গতকাল আমার শৈশবের এক বন্ধু বলছিল, ‘আমি কভিডে মরতে চাই, না খেয়ে মরতে চাই না।’”

লেখক : দ্য টাইমসের কলামিস্ট, দুইবার পুলিত্জার পুরস্কারপ্রাপ্ত

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস