কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়ালেও তার চোখে চোখ রেখে লড়ে গেছে যে দেশ, সে দেশের নাম চীন। ১৭ বছর আগের সার্স এবং এবারের করোনা, এ দুটি মহামারির সময়ই আমি চীনের উহান শহরে। এই শহরে অবস্থান করে খুব কাছ থেকে মহামারির বিরুদ্ধে চীনাদের জয়লাভ করার লড়াই দেখার যে বিরল সুযোগ হয়েছে, এ লেখায় ভাগাভাগি করতে চাই সে অভিজ্ঞতা।

কভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে মহামারির রূপ নেওয়ার আগে চীনের উহানে এটি সর্বপ্রথম মহামারির রূপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় চীনের করোনা আক্রমণের কেন্দ্র উহানে গত ২৩ জানুয়ারি ‘কমপ্লিট লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছিল।

চীনের এই লকডাউন এবং আমাদের বাংলাদেশের লকডাউনের উদ্দেশ্য এক হলেও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যাপক ফারাক রয়েছে। বাংলাদেশে শুরুর দিকে অনেকে লকডাউন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। ছুটি বা হরতালের মতো কিছু ভেবে সেইমতো চলছিল। অথচ এই লকডাউন হচ্ছে প্রবল সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ভাইরাসের করাল থাবা থেকে বেঁচে থাকার এখন পর্যন্ত হাতে থাকা একমাত্র কার্যকর উপায়।

উহানে যখন প্রথম লকডাউন হয়, তখন এখানেও প্রায় আমাদের বাংলাদেশের মতোই নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেকের বাসায় খাদ্যসামগ্রী মজুদ ছিল না। কারণ তখন ছিল চীনের সবচেয়ে বড় উৎসব নতুন বছরের ছুটি। পাশাপাশি উহান শহরে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

আবার চীনাদের লকডাউনের পূর্ব-অভিজ্ঞতাও ছিল না। আবার যেহেতু রোগটি একেবারেই নতুন, তাই সে সময় এই ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কও ছিল এখনকার চেয়ে অনেক বেশি। এর মধ্যেই চীনারা সেই পাহাড় সমান আতঙ্ক জয় করেছে, পরাভূত করেছে করোনা দানবকে। নিজেই দেখেছি, সেই কঠিন সময়ে চীনারা দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে গেছে। প্রকৃত অর্থেই কেউ বাড়ি থেকে বের হয়নি। লকডাউন শতভাগ মেনেছে।

শুরুর দিকে সুপারমার্কেটগুলো খোলা ছিল। প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে একজন সুস্থ ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট সময়ে ওই সুপারমার্কেটে যেতে পারতেন। কিন্তু পরে দেখা গেল, ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা এত বেশি যে সুপারমার্কেটও আর নিরাপদ নয়।

তখন নিয়ম হলো, প্রতিটি পাড়া বা মহল্লার জন্য একজন নির্দিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন (সাধারণত তিনি কমিউনিস্ট পার্টির যুবা), তিনি তাঁর ওই এলাকার প্রতিটি পরিবারের চাহিদামতো প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনে এনে সবার মধ্যে বণ্টন করে দেবেন।

সরকার ঘোষণা করে, বিল বকেয়া থাকলেও নাগরিকদের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোনসহ অন্যান্য জরুরি পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। আমরা যারা বিদেশি ছিলাম, আমাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও সবাইকে দুই মাসের অতিরিক্ত ভিসা দেওয়া হয়, যাতে কেউ আতঙ্কিত না হয়।

চীনে মোটামুটি সবাই অনলাইনে কেনাকাটায় অভ্যস্ত। বাজার বন্ধ থাকলেও গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ কোটি মানুষ অ্যাপের মাধ্যমে খাবার অর্ডার করেছে এবং ডেলিভারি পেয়েছে। সরকার কম আক্রান্ত অন্য এলাকাগুলো থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও জোগান দিয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। 

এখন বিশ্বজুড়ে স্যানিটাইজার, মাস্ক, পিপিই ইত্যাদির জন্য হাহাকার। চীনেও যে এসবের জন্য হাহাকার ছিল না, তা কিন্তু নয়। ২২ ও ২৩ জানুয়ারি এই দুই দিন আমি নিজে হন্যে হয়ে মাস্ক আর স্যানিটাইজার খুঁজে বেড়িয়েছি। পাইনি। তখন আসলেই কঠিন পরিস্থিতি ছিল। এত সংকটের পরও দেড় কোটি মানুষের উহান শহর জীবন বাজি রেখে পুরো

বিশ্বকে দিয়েছিল মহামূল্যবান দুই মাস সময়। বিশ্বের মানুষ যদি এ সময়টা কাজে লাগাত, তাহলে হয়তো আজ এ পরিস্থিতি থেকে অনেকটা মুক্তি পেতে পারতাম আমরা। চীনের উহান শহর করোনাভাইরাস রুখে দিয়ে বিশ্ববাসীর কানে কানে ফিসফিস করে বলেছে, ‘হ্যাঁ, এই করোনা দানবের সঙ্গেও মল্লযুদ্ধে জেতা সম্ভব। এই দেখো আমরা জিতেছি।’

চীনারা সরকারিভাবেই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সর্বশক্তি দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উৎপাদন ও বণ্টন অব্যাহত রেখেছিল। সচল রেখেছিল অর্থনীতির চাকা। করোনাভাইরাস পরাভূত হওয়ার পর এখন চলছে তাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের যুদ্ধ। এই বিষয়টিতেও দৃষ্টি দেওয়ার সুযোগ আছে বাংলাদেশের।

করোনাভাইরাস দমনে চীনের বর্ষীয়ান ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ডা. চুং নান শানের নেতৃত্বে চীনারা একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। শুরুর দিকে ভাইরাস পরীক্ষার সুযোগ কম থাকলেও যতই সময় গড়িয়েছে, তারা পরীক্ষার সুযোগ ও পরিসর বাড়িয়েছে।

চীনাদের এই করোনাভাইরাস যুদ্ধ বিজয়ের পেছনের মূল কারণ কিন্তু এটি। পরীক্ষায় ভাইরাস সংক্রমণ নিশ্চিত হলে তারা সংক্রমিতদের দুটি ভাগে ভাগ করেছে। মৃদু বা স্বল্পমাত্রায় আক্রান্তদের জন্য স্টেডিয়াম, স্কুল ইত্যাদি স্থানে সাময়িক আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্য রোগীদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে সাধারণ হাসপাতাল।

মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের জন্য ছিল আইসিইউ এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল। এতে করে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের বিশেষ সেবাদান সহজ হয়েছে এবং নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে মৃত্যুহার। আক্রান্ত রোগীদের কাছাকাছি আসা মোটামুটি সবাইকে তারা সফলভাবে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছে। এ কাজে তারা বিভিন্ন সফটওয়্যার এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তা নেয়।

পুরো চীনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪২ হাজার মেডিক্যালকর্মী পৌঁছে যান উহানে। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৬ লাখ ব্যক্তির পরীক্ষা করা হয়। আর ১০ দিনে ছয় লাখ ৪৫ হাজার বর্গফুটের হাসপাতাল নির্মাণ করা—এসব তো এখন সবার জানা।

চীনের আপৎকালীন আইসোলেশন ইউনিটগুলো পুরো পরিস্থিতি পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কারণ বেশির ভাগ রোগীই ছিল মৃদু আক্রান্ত। এদের যদি বাড়িতে আলাদা করে রাখা হতো, সে ক্ষেত্রে রোগ বেশি ছড়াত এবং এত দ্রুত সাফল্য পাওয়া যেত না। কিন্তু মৃদু আক্রান্ত রোগীদের একত্রিত করে আইসোলেশন ইউনিটে এনে উপযুক্ত পরিচর্যা করার ফলে তারা যেমন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে, তেমনি সংক্রমণও কমতে শুরু করে। আবার এদের আলাদা করার ফলে মূল হাসপাতালে রোগীর চাপ কমতে শুরু করায় ডাক্তাররা গুরুতর রোগীদের আরো বেশি করে সেবা দেওয়ার সুযোগ পান। 

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চীনারা সফল হয়েছে ভুলভ্রান্তিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। কিছুটা দেরি হয়ে গেলেও সবার সমন্বয়ে বাংলাদেশেরও পরিকল্পনাটি গুছিয়ে করার সময় ও সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিভাগ বা আক্রান্ত এলাকাভিত্তিক আইসোলেশন ইউনিটের ধারণাটি ডা. চুং নান শানের সহকর্মী ডা. চাং ওয়েন হং গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তুলে ধরেছিলেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি খুবই ভালো একটি সমাধান হতে পারে। ভালো থাকো  প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখক : পরিচালক, ‘এক অঞ্চল এক পথ’ গবেষণা কেন্দ্র, উহান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, উহান, চীন।