২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনে সর্বপ্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে করোনাভাইরাস গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ২৬ মার্চ থেকে সরকার জাতীয় ছুটি ঘোষণা করে। এরপর থেকেই দেশে মাথা মুণ্ডন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি আপলোডের হিড়িক পড়ে যায়। শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশ লক্ষণীয়।

ইসলামের আলোকে মাথা মুণ্ডনের বৈধ কারণ

ইসলাম সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া মাথা মুণ্ডন করাকে নিন্দা করেছে। তবে চারটি ক্ষেত্রে মাথা মুণ্ডন করাকে ইসলামে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

১. নবজাতক শিশুর মাথা মুণ্ডন করা

সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে অভিভাবকের দায়িত্ব হলো—সন্তানের আকিকা করা, মাথার চুল মুণ্ডন করা এবং তার সুন্দর নাম রাখা। হাদিস শরিফে এসেছে, আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান (রা.)-এর পক্ষ থেকে একটি ছাগল আকিকা করেছিলেন এবং বলেছিলেন, হে ফাতিমা! এর মাথা মুণ্ডন কর এবং তার চুলের ওজন পরিমাণ রুপা সদকা করে দাও। (তিরমিজি, হাদিস, ১৫২৫)

২. হজ বা ওমরাহর সময়

হজ ও ওমরাহর নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা শেষে পুরুষের মাথা মুণ্ডন করতে হয় বা মাথার চুল ছাঁটতে হয়। এমনকি নারীদের চুলের অগ্রভাগের কিছু অংশ কাটারও নির্দেশ রয়েছে। হজের সময় নবীজি (সা.) নিজেও মাথা মুণ্ডন করতেন। বুখারি শরিফে উল্লেখ রয়েছে, নাফে (রহ.) থেকে বর্ণিত, ইবনে ওমর (রা.) বলতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজের সময় তাঁর মাথা মুণ্ডন করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৬১৮)

৩. নওমুসলিমের মাথা মুণ্ডন

ভিন্ন ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রাক্কালে মাথা মুণ্ডন বৈধ। হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহের কথা নবীজি (সা.)-কে জানান। নবীজি (সা.) তাঁকে মাথা মুণ্ডন করে আসতে নির্দেশ দেন। (জামেউল আহাদিস)

৪. রোগাক্রান্ত ব্যক্তির মাথা মুণ্ডন

স্বীকৃত ডাক্তারের পরামর্শক্রমে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি রোগমুক্তি বা চিকিৎসার সুবিধার জন্য মাথা মুণ্ডন করা ইসলামে বৈধ।

বৈধ কারণ ছাড়া মাথা মুণ্ডন নিন্দনীয়

যৌক্তিক কারণ ছাড়া মাথা মুণ্ডন করা ইসলামে নিন্দনীয়। মহানবী (সা.) অহেতুক মাথা মুণ্ডন করাকে অপছন্দ করতেন। আবু বুরদাহ ইবনু আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু মুসা আশআরি (রা.) কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন। এমনকি তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। তখন তাঁর মাথা তাঁর পরিবারভুক্ত কোনো এক নারীর কোলে ছিল। তিনি তাঁকে কোনো জবাব দিতে পারছিলেন না। জ্ঞান ফিরে পেলে তিনি বলেন, সেসব লোকের সঙ্গে আমি সম্পর্ক রাখি না যাদের সঙ্গে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব নারীর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের কথা প্রকাশ করেছেন, যারা চিত্কার করে ক্রন্দন করে, যারা মস্তক মুণ্ডন করে এবং যারা জামা কাপড় ছিন্ন করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২১৯)

বিপদে মুসিবতে যেমন কেউ মৃত্যুবরণ করলে ধৈর্য ধারণ না করে তার জন্য বিলাপ করা, চুল-দাড়ি উপড়ে ফেলা ইত্যাদি বৈধ নয়। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে, কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেললে অধৈর্য হয়ে তার জন্য মাথা মুণ্ডন করাও ইসলাম সমর্থন করে না। সাফওয়ান ইবনে মুহরিজ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু মুসা (রা.) বেহুঁশ হয়ে গেলে তাঁর জন্য সবাই ক্রন্দন করতে লাগলেন। তখন তিনি বলেন, আমি তোমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলছি, যেরূপ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে বিপদে চুল বা দাড়ি উপড়ে ফেলে, আঁচল ছিঁড়ে ফেলে এবং সজোরে ক্রন্দন করতে থাকে। (নাসায়ি, হাদিস : ১৮৬৪)

নবীজি (সা.) মাথা মুণ্ডন করাকে খারেজিদের আলামত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পূর্বাচল থেকে একদল লোকের অভ্যুদয় ঘটবে। তারা কোরআন পাঠ করবে, তবে তাদের এ পাঠ তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তারা দ্বিন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেভাবে শিকার (ধনুক) থেকে তীর বেরিয়ে যায়। তারা আর ফিরে আসবে না, যে পর্যন্ত তীর ধনুকের ছিলায় না আসে। বলা হলো, তাদের আলামত কী? তিনি বলেন, তাদের আলামত হলো মাথা মুণ্ডন করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০৫২)

করোনাকালে মাথা মুণ্ডন

করোনাভাইরাস একটি সংক্রমণ ভাইরাস। এ অবস্থায় সেলুনে গিয়ে নরসুন্দরের কাছে চুল কাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এর দ্বারা যে চুল কাটছে আর যার চুল কাটা হচ্ছে এবং তাদের সংস্পর্শে আসা সবাই করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর পাশাপাশি দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য ওষুধের দোকান, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকান ছাড়া সব ধরনের দোকান সরকার বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেলুন বন্ধ থাকার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজ বাসায় মাথা মুণ্ডন করা যেতে পারে বলে একদল আলেম অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে মাথা মুণ্ডন করলে বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে—এ জাতীয় ধারণা পোষণ করা যাবে না। মাথা মুণ্ডনকে উৎসবে পরিণত করা যাবে না। বরং এটিকে আপত্কালীন সময়ের বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—পুরো মাথাই মুণ্ডন করতে হবে। মাথার কিছু অংশ মুণ্ডন করা এবং কিছু অংশ মুণ্ডন না করা ইসলামে নিষিদ্ধ। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত,  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ছেলেকে দেখলেন যে তার মাথার কিছু অংশ মুণ্ডিত আর কিছু অংশ অমুণ্ডিত। তিনি এরূপ করতে নিষেধ করে বলেন, তোমরা হয়তো পূর্ণ মাথা মুণ্ডাবে অথবা পূর্ণ মাথায় চুল রাখবে। (নাসায়ি, হাদিস : ৫০৪৭)

অন্য হাদিসে এসেছে ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাজা করতে (মাথার কিছু অংশ মুণ্ডন করে কিছু অংশে চুল রাখতে) নিষেধ করেছেন। (নাসায়ি, হাদিস : ৫০৫০)

আর প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মাথা মুণ্ডন করাকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের মাথা মুণ্ডন করতে নিষেধ করেছেন। (নাসায়ি, হাদিস : ৫০৪৮)

মহান আল্লাহ আমাদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন, করোনা মহামারিসহ যাবতীয় রোগব্যাধি, বিপদাপদ, বালা-মুসিবত থেকে মুক্তি দান করুন। আমিন।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।