যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি মেইলে’র অনলাইন ভার্সানে গত ১৮ এপ্রিল ‘করোনাভাইরাস মহামারি’ ছড়িয়ে দেয়ায় চীনের ভূমিকা নিয়ে একটি নতুন সিরিজ প্রতিবেদনের প্রথম কিস্তি প্রকাশ করা হয়। এরআগে ‘মেইল’ উহানে ভাইরাসটির সুতিকাগার এবং চীনা কর্তৃপক্ষ দারা ভাইরাসটির বিস্তার ঘটানোর খবর চাপা দেওয়ার অভিযোগসহ নানা বিষয়ে অনুসন্ধান চালায়। সর্বশেষ ২০ এপ্রিল প্রতিবেদনের শেষ কিস্তিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, ‘কোভিড-১৯’কে কেন্দ্র করে চীন পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক মন্দাবস্থাকে কাজে লাগাতে চায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন মহামারি উত্তরকালে আমেরিকার কাছ থেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশের তকমা ছিনিয়ে নিতে চায়। একই সংগে তারা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সুবাদে পাশ্চাত্যকে ঝুঁকে পড়তে দেখাটাই পছন্দ করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অদম্য বাসনা পূরণে উর্দ্ধগামী চীনকে কে বা কারা রুখতে পারে?

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বেশ কয়েকটি বিলম্বিত ‘ভিডিও ক্লিপ’ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়। গত ২২ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের এক পাহাড়ের মাঝখান অবধি একটি ভিডিও চিত্র ধারণ করা হয়। একই দিন চীনের উহান নগরীতে বিলম্বিত লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এই শহরেই করোনা ভাইরাসের প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। এই রোগে বিশ্বব্যাপী এ যাবৎ প্রায় ২ লাখ লোক মারা গেছেন। এই শহরের হুয়ানান সামুদ্রিক মাছের বাজার থেকে ভাইরাসটি মানবদেহে সংক্রমিত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনের চিকিৎসা কর্মী ও গবেষকসহ অন্যরা, যারা মহামারি আকারে সম্ভাব্য একটি দুর্যোগ সম্পর্কে চীনা নাগরিক তধা বিশ্ববাসীকে সতর্ক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তাদেরকে নিশ্চুপ করাতে বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ প্রায় এক মাস সময় ব্যয় করেন।

তখনও করোনা ভইরাস সস্পর্কে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ পায়নি। গত জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে করোনাভাইরাসের বিস্তার সম্পর্কে সারাবিশ্বের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হতে থাকে। সেই সংগে চীনের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করার জল্পনাও বদ্ধমূল হয়।

ইতিমধ্যে বিশ্বের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সুইজারল্যান্ডের অবকাশ কেন্দ্র দাভোসে মিলিত হন। তারা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্ব নির্ধারিত বার্ষিক সভায় যোগ দেন। সভায় নজর কাড়া বক্তাদের মধ্যে ছিলেন- সিঙ্গাপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাবেক কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানী। তিনি ‘চীন কি বিজয়ী হয়েছে?’ শিরোনামে একটি নতুন ও বহুল আলোচিত গ্রন্থের রচয়িতা। এই গ্রন্থে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পিছনে ফেলে চীনের বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার হওয়ার নিরলস প্রচেষ্টা তুলে ধরা হয়। করোনাভাইরাসজনিত সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই এই গ্রন্থটির রচনা সম্পন্ন হয়।

বৈঠক চলাকালে অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক ‘ডয়েশে ব্যাংক’-এর একজন প্রতিনিধি মাহবুবানীর চিত্রায়িত সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন। তিনি মাহবুবানীর কাছে তার গ্রন্থের শিরোনাম ‘চীন কি বিজয়ী হয়েছে?’র যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চান ‘চীন কি আসলেই সফলকাম হয়েছে?’ জবাবে মাহবুবানী দুর্বোধ্য হাসি দিয়ে বলেন, ‘এখনও না’।

দশ মিনিটের ওই সাক্ষাতকারে মাহবুবানী আমেরিকার ধনতন্ত্রের সঙ্গে তার ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দীর তুলনা করে বলেন, ‘চীন ক্রমেই গুনশালী হয়ে উঠছে এবং সবচেয়ে তরুণ ও গতিশীল মেধাসম্পন্ন নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে’। কাজেই এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, চ্যালেঞ্জ গ্রহণের বিষয়টি ক্রমেই উন্মুক্ত হচ্ছে। তাছাড়া ৬৬ বছর বয়সেও প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যথেষ্ট সজিব-সবল।

চীনের উচ্চাভিলাষ সম্পর্কে মাহবুবানীর বক্তব্যের পর আমরা এখন জানা যাচ্ছে, চীনে নতুন এই দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য নেতৃবৃন্দের সমালোচনা করায় হাজার হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

কিন্তু দাভোস সম্মেলনে এ ব্যাপারে একটি শব্দও খরচ করা হয়নি। গ্রন্থ প্রণেতা মাহবুবানীতো নয়ই, এমনকি যিনি সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন তিনিও এ ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করেননি। মাহবুবানীকে অবশ্য চীনা কমিউনিষ্ট পার্টি এবং দেশটির গত ৪০ বছরের পরিশ্রমের ফসল ‘অলৌকিক অর্থনীতি’র কট্টর সমর্থক হিসেবে ধরা হয়।

মাহবুবানীকে একনায়কতন্ত্রের পূজারিও বলা হয়। এমনকি তার বিরুদ্ধে ১৯৮৯ সালে তিয়ানমেন স্কয়ারে গণহত্যা এবং কোভিড-১৯-এর বিষয়ে তথ্য গোপনকে দলের সাফল্যের চাবিকাটি হিসেবে বর্ণনা করার অভিযোগ আছে।

এরপরও ক্রমবর্ধমান বিতর্কের কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। ‘দ্য ইকোনিমিস্ট’ সাময়িকীর চলতি সংখ্যায় মাহাবুবানীর মূল প্রশ্নকে প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম করে লিখেছে ‘চীন কি জিততে চলেছে?’ হতে পারে চলমান আন্তর্জাতিক বিপর্যয় থেকে চীন আর্থিকভাবে লাভবান হবে এবং প্রভাব বিস্তারে সফল হবে। এ কারণে অনেকেই ধারণা করছেন, এই বিপর্যয় চীনের সৃষ্ট।

এদিকে চীন ইতিমধ্যে করোনা বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছে এবং সেখানে দ্রুত স্বাভাবিক জীবন ফিরে এসেছে। এমনকি কিছু কিছু কল-কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু হয়েছে। উহানে করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর যেসব চিকিৎসা কর্মী উহানবাসীর সাহায্যে বাইরে থেকে এসেছিলেন তাদের শেষ দলটিকে সম্প্রতি বিদায় সম্বর্ধনা জানানো হয়।

ধারণা করা হচ্ছে নতুন বছরের প্রথম তিন মাসে করোনাভাইাসের দ্রুত বিস্তৃতি ঘটার পরও চীনের অর্থনীতি মাসের দ্বিতীয় ভাগে শতকরা ৮ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে।

এদিকে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশে এখনও লকডাউন বলবৎ রয়েছে এবং সেখানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশংকা করা হচ্ছে। এসব দেশের শেয়ার বাজারগুলোতে ধ্বস নেমেছে এবং বেকারত্ব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

যুক্তরাজ্যের বাজেট প্রনয়ণ কার্যালয় আশংকা করছে, এই দুর্যোগের কারণে সেদেশের জিডিপিতে শতকরা ৩৫ ভাগ পর্যন্ত ধ্বস নামতে পারে। অপরদিকে জনগণের জীবনমান তদারককারি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নীতি নির্ধারণী সংস্থা ‘রেজুলেশন ফাউন্ডেশন’ মনে করে আগামী তিন মাসে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লোক কর্মহীন বা বেকার হয়ে পড়বে।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এই বিপর্যয়ে কলকাঠি নাড়ার জন্য চীনা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ইতিমেধ্যে বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এদিকে গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ডোমিনিক রাব বলেন, সংকট মিটে গেলেও চীনের সংগে আর কখনও স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে না। আমাদেরকে কঠিন হলেও প্রশ্ন করতে হবে ‘কিভাবে এর বিস্তার ঘটেছে এবং কেন তা আগেভাগে বন্ধ করা গেল না।

ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের নীরব সদস্যরাও আজ সোচ্চার। তারা গত জানুয়ারিতে চীনের টেলিকমিউনিকেশন জায়েন্টের সংগে বিতর্কিত চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী হাউয়াইভিত্তিক এই কোম্পানীর বৃটেনকে ফাইভ-জি অকাঠামোতে যন্ত্রপাতি সরবরাহের কথা রয়েছে। কোম্পানীটির বিরুদ্ধে তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কেবল রাজনীতিবিদই নন, বৃটেনের সাধারণ মানুষও ওই চুক্তিকে ক্ষুব্ধ।

কট্টর রক্ষণশীলদের নীতি নিধারনী সংস্থা ‘হেনরি জ্যাকসন সোসাইটি (এইচজেএস)’র এক জরিপে বলা হয়, শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি বৃটিশ চীনের বিরুদ্ধে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ তদন্তের পক্ষে। অপরদিকে শতকরা ৭০ ভাগ বৃটিশ চায় সরকার চীনের কাছ থেকে ৩৫ হাজার কোটি পাউন্ড আদায়ে মামলা করুক। শতকরা প্রায় ৭৪ ভাগ বৃটিশ কোভিড-১৯’কে বিশ্ব্যাপী চড়িয়ে দেয়ার জন্য চীনকে দায়ি করে। ব্রাসেলসও বেইজিংকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিযোগিতা কমিশনের প্রধান মারগ্রেথ ভেস্টেগার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরকার প্রধানদের প্রতি তাদের শেয়ার বাজারে চীনের কারসাজি ঠেকাতে দেশের ‘স্ট্রাটেজিক এ্যসেট কোম্পানীগুলো’র শেয়ার ক্রয়ের পরামর্শ দিয়েছেন।

বেইজিংয়ে সাবেক বৃটিশ কূটনীতিক ও এইচজেএস-এর এশিয়া স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক ম্যাথিউ হেন্ডারসন বলেছেন, অনেক বিষয়েই যথেষ্ট বিলম্ব হয়েছে। তিনি দ্য মেইল’কে বলেন, ‘আমরা গত দুই দশক ধরে শুধু পিছনে ঝুঁকেছি এবং বিশ্বাস করেছি চীন থামতে জানে না, আর তাদের সংগে ব্যবসা করা উভয়ের জন্য লাভজনক। আসলে সবাই চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে। সব কিছু মিটে গেলে সেই চীনকে আর পাওয়া যাবে না, একদিন আমার যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলাম। এখন আমাদের সোজা সাপ্টা কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা কেন আগ্রাসী চীনের সাহায্যপ্রার্থী হলাম? যারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারির ব্যাপারে যারা সত্য গোপন করেছে এবং যাদের ভাষ্যে আস্থা রাখা যায় না। আমরা কি কোন কোন পণ্যের ব্যাপারে তাদের ওপর নির্ভরতাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি না।

হেন্ডারসন বলেন, বেশ কয়েকটি হাই-টেক বৃটিশ শিল্প এবং প্রায় সবকটি একাডেমিক রিসার্চ ও ডেভলপমেন্ট ইনস্টিটিউশন চীনের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে।

লন্ডনে বসবাসকারি চীনের ভিন্ন মতাবলম্বী লেখক মা জিয়ান এ সপ্তাহে দ্যা মেইলের সংগে এক সাক্ষাতকারে স্বীকার করেন, দীর্ঘ দু’মাসেরও বেশি সময় পর আমরা আজও জানতে পারিনি চীনে কতলোক মারা গেছেন কিংবা এই রোগের উৎস কি। পাশ্চাত্য এমন এক শাসকগোষ্ঠীর সংগে লেনদেন করছে যারা মোটেই বিশ্বসযোগ্য নয়। যারা মনে করেন চীনকে তারা গণতন্ত্রের পথে চালিত করবেন, তাদের জন্য এই ভাইরাস এক বেদনাদায়ক শিক্ষা।

সত্তরের দশকের শেষ দিকে দেং শিয়াও পিং প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণের পর চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সমাজের ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে দেশের অর্থনীতির শিকড় থেকে ডালপালা পর্যন্ত সর্বত্র আমূল পরিবর্তন আনার এক অসাধারণ মিশন পরিচালনা শুরু করে। ফলশ্রুতিতে গত ২৭ বছরের মধ্যে কেবল গত বছরের তৃতীয় ভাগে তাদের প্রবৃদ্ধিতে শ্লথ গতি লক্ষ করা যায়। প্রবৃদ্ধিতে বলতে গেলে ধ্বস নামলেও তা শতকরা ৬ ভাগে দাঁড়ায়। অপরদিকে গত বছর যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি ছিল শতকরা মাত্র ১.৪ ভাগ।

১৯৯৯ সালে চীন ছিল যুক্তরাজ্যের ২৬তম বৃহৎ রফতানি বাজার। ২০১৮ সালে এই অবস্থান দাঁড়ায় ৬ষ্ঠ স্থানে। ভবিষ্যতে এই অবস্থানের আরো পরিবর্তন হবে। অপরদিকে ২০১৮ সালে চীন যুক্তরাজ্যে পণ্য আমদানির চতুর্থ উৎসে পরিণত হয়। চীনা পণ্যের বার্ষিক আমদানী গত ১৯ বছর ধরে বেড়েই চলেছে। অপরদিকে বাড়ছে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যে ঘাটতি।

সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গতবছর করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঘাটতির পরিমাণ ২ হাজার ২শ; ১০ কোটি পাউন্ডে দাঁড়ায়। ধারণা করা হচ্ছে চীনা অর্থনীতির অবিরাম উত্থানের ফলে ২০২০ সাল নাগাদ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে স্পর্শ করবে।

দাভোসে ওই সাক্ষাতকারে মাহবুবানী বলেন, চীনাদের অভিলাষ সম্পর্কে জানতে হলে চীনা নেতৃবৃন্দের মনোভাব এবং তাদের মনোস্তাত্ত্বিক শক্তি সম্পর্কে ধারণালাভ জরুরি। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আফিম যুদ্ধের কারণে শত বছর ধরে তারা নিগৃহের শিকার হয়েছে। চীনে তখন আফিম বেচা-কেনা নিষিদ্ধ ছিল। অপরদিকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী জোরপূর্বক ভারত থেকে চীনে আফিম নিয়ে যেত। ১৮৪০ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত বৃটিশদের বিরুদ্ধে চলা এই যুদ্ধে চীনারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ঠিক এ সময়েই গণ-প্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। চীনের চার হাজার বছরের ইতিহাসে ওই একশ’ বছর ছিল সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সময়। তারা আর কখনও এমন পরিস্থিতির শিকার হতে চায় না। অর্থাৎ তারা এখন অনেক কুশলী, সুশৃঙ্খল এবং সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা গ্রহণে পারদর্শী। ২০৪৯ সালে তারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা গ্রহণের শতবর্ষ উদযাপন করবে। এই সময়ের মধ্যে তারা সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। দৃশ্যত: তারা এই লক্ষ্য পূরণে অবিচল। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার শত বছরের গৌরব গাঁথা থেকে বেরিয়ে আসছে। কারণ তারা অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী।

২০১৩ সালে শি জিনপিং চীনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তিনি কঠোর নীতি অনুস্মরণ করে এগিয়ে যাচ্ছেন। গত বছর এক ভাষণে কমপক্ষে ৬০ বার তিনি স্ট্রাগল (সংগ্রাম) শব্দটি উচ্চারণ করেন। তিনি অঙ্গিকার করেন, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা গ্রহণের শতবর্ষ ২০৪৯ সালের আগে যে কোন মূল্যে চীনা জাতির মহান নবজাগরণ অর্জিত হবে।

এ বছরের ২৩ জানুয়ারি, যেদিন উহানে লকডাউন ঘোষণা করা হয় এবং রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় সেদিন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিংয়ে এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। সেখানে তিনি দ্রুত বিস্তার ঘটতে যাওয়া করোনাভাইরাস সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। বরং প্রজাতন্ত্রের শতবর্ষের লক্ষ্য জাতীয় নবজীবনের স্বপ্ন পূরণে সময়ের বিরুদ্ধে তাল মিলিয়ে চলা এবং পিছিয়ে না পড়ার ওপর জোর দেন।

এই লক্ষ্য অর্জনে শি’র অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হচ্ছে চীনের উৎপাদন ভিত্তি উন্নয়নে ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। তিনি রফতানীর জন্য কম মূল্যের পণ্য তৈরীর পরিবর্তে ‘হাই-টেক প্রযুক্তি’ তথা উচ্চ মূল্যের শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কারণেই আজ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগে চীনের বিপুল সংখ্যক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীকে দেখা যায়। এই পরিকল্পনায় চীনের মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেড়েছে এবং বিদেশি ভোগ্য পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পেয়েছে।

গত ৪ মার্চ চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা ‘সিনহুয়া’য় একটি উল্লেখযোগ্য মতামত প্রকাশিত হয়। সেখানে সংগ্রামরত আমেরিকার বিপরীতে চীনের দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কথা ফলাও কওে প্রচার করা হয়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব তখন কেবল শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। মতামতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণবন্ত রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সংকট মোকাবিলায় চীনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্প অবশ্য ক্ষমতা গ্রহণের পর চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

চীন যখন নতুন ধরনের এই নিউমেনিয়া নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য্য সাফল্য অর্জন করেছে যুক্তরাষ্ট্রে তখন করোনাভাইরাসের ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিদিনই একের পর এক রাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসা সামগ্রী খুবই অপ্রতুল এবং মহামারি আকোরে সারাদেশে ‘করোনারি নিউমেনিয়া’র প্রাদুর্ভাব অত্যাসন্ন বলে মনে করা হচ্ছে। এখন সেখানে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার লোক মারা যাচ্ছে।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ার বাজারে প্রতিদিনই ধ্বস নামছে। মাত্র এক সপ্তাহে শেয়ার মূল্য শতকরা ১২ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। শেয়ার মার্কেটে ধ্বস নামা অব্যাহত থাকলে তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, ট্রাম্পের গদি রক্ষাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কাজেই আমেরিকা দুর্বল এবং চীন শক্তিশালী বলে যে রটনা রয়েছে তা কোন ভুল বার্তা নয়। অপরদিকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বইরে তেমন মনযোগী হতে না পারলেও চীন পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকপিটভ ইকুইপমেন্ট) কূটনীতি শুরু করেছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এক মাসে তারা ৪০ লাখ মাস্ক এবং ত্রাণ সাহায্য পাঠিয়েছে। এছাড়া ভাইরাস আক্রান্ত মাদ্রিদে তারা ট্রেন বোঝাই করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠিয়েছে।

দ্য মেইল, এ সপ্তাহে মাহাবুবানীর সঙ্গে কথা বলেছে এবং তিনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনের দূরদর্শিতার প্রশংসায় অবিচল থেকেছেন। তিনি বলেন, সংকটের প্রথমদিকে তারা এক বা দুটি ভুল করে থাকতে পারে। তবে দেশটি দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে এবং ১৪০ কোটি লোকের বিশাল দেৃশটির অধিকাংশ বাসিন্দাকে এই রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নাগরিকদের তা পালনে সক্ষম হওয়ার ক্ষেত্রে চীনের জুড়ি নেই। একারণে নববর্ষের প্রাক্কালে তারা সবকিছু বন্ধ করতে সক্ষম হয়। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এমন কোন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা একেবারেই অসম্ভব।

একারণে বলা যায়, চীন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ারের খেতাব ছিনিয়ে নিতে চাইলে তা অসম্ভব কিছু হবে না।